জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নারীদের সংগঠন জাতীয় নারী শক্তিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ফারজানা আফরোজ। বেশ কিছু দিন ধরেই তিনি নিজেকে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির স্ত্রী দাবি করে আসছেন তিনি। ওই নারীকে নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই এবার তালাকের নোটিশ ও কথিত কাবিননামা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। এসব নিয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে রনি বলেছেন, ‘নাহিদরা কেন ওই মহিলার প্রতি আকৃষ্ট।’
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফারজানা বলেছিলেন, ’আমি নারী শক্তিতে যোগ দিচ্ছি। যোগদানের পরই বিস্তারিত জানতে পারবেন।’ এ সময়ও তিনি নিজেকে সাবেক সংসদ সদস্য রনির স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন এবং রনির সঙ্গে বিয়ের কাবিননামা প্রকাশ করেন। ওই কাবিননামায় ২০২২ সালের ১৩ মে তাদের বিয়ে হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে রনি ফারজানাকে স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করে আসছিলেন। অন্যদিকে ফারজানার দাবি, রনি তাঁকে বিয়ে করেছিলেন এবং তার শাশুড়িও কয়েক মাস তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
ফেসবুক পোস্টে ফারজানা আফরোজকে নিজের স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করে সাবেক সংসদ সদস্য রনি আরো বলেন, ‘এটা ওদেরকেই জিজ্ঞাসা করেন, যে মহিলা বলেছে তাকে জিজ্ঞাসা করেন। এনসিপির ওদের জিজ্ঞাসা করুন, আমি এটা নিয়ে ফেসবুকে লিখতেছি, ওটা দেখেন।’ এরপরই আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দেন নি তিনি। ঘণ্টা খানেক পর রাত সোয়া আটটায় রনি পোস্টে লেখেন, ‘কি আর বলবো? এই মহিলার বিরুদ্ধে নীলক্ষেত থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা আছে। শাহবাগ থানা পুলিশ এই মহিলা সম্পর্কে ভালো সাক্ষী দিতে পারবে।’ পরে আবার এ নিয়ে ফারজানার সঙ্গে কথা বললে তিনি দুই পৃষ্ঠার একটি কাবিননামা পাঠান। পোস্টে তালাকনামার ছবিও শেয়ার করেন রনি।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে কটাক্ষ করে স্ট্যাটাসে গোলাম মওলা বলেন, ‘উল্লেখিত ঘটনার এতো পরে এনসিপির নাহিদরা কেন আমার স্ত্রী দাবি করা মহিলার প্রতি এতোটা আকৃষ্ট হলো এবং এই মহিলার নেতৃত্বে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলো তা আমার বোধগম্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জমানায় আমার মতো বহু মানুষকে কিভাবে বিভিন্ন সিন্ডিকেট জিম্মি করতো তা যদি কেউ জানতে চান তবে শাহবাগ থানায় করা আমার অভিযোগটি পড়তে পারেন। আমার জীবনটি আমার আপনজন, প্রতিপক্ষ এবং শত্রুদের জন্য উন্মুক্ত। গোপন, লুকোচুরি এবং অন্যায়ের সঙ্গে সমঝোতার মতো কোনো ঘটনা নেই। জীবনের সব ঝড় মোকাবেলা করেছি, কিন্তু আপস করিনি। কারো সঙ্গে লাগতে যাইনি কিন্তু কেউ লাগতে এলে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মোকাবেলা করেছি।’
ফেসবুক পোস্টে গত বছর নিউমার্কেট থানায় করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কপিও প্রকাশ করেন রনি। ২৯ জুন করা ওই জিডির আবেদনে রনি উল্লেখ করেন, কাজের প্রয়োজনে ২০২২ সালের ৫ মে চট্টগ্রামে গিয়ে তিনি হোটেল রেডিসনে অবস্থান করছিলেন। পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে ফারজানা আফরোজ তাঁর মা, ছেলে-মেয়ে এবং এক জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৯-১০ জনকে নিয়ে হোটেল কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ছবি তোলার ঘটনা পর্যন্ত তাঁর মনে আছে বলে উল্লেখ করেন রনি। জিডির আবেদনে তিনি আরও দাবি করেন, এক পর্যায়ে হুঁশ ফিরে পেয়ে নিজেকে হোটেল কক্ষে অসংলগ্ন অবস্থায় দেখতে পান। তখন ফারজানাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তাঁদের বিয়ে হয়েছে এবং কলমা-কাবিনের মাধ্যমে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। পরে কৌশলে হোটেল ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন বলে আবেদনে উল্লেখ করেন।
রনির অভিযোগ, এরপর ফারজানা আফরোজ বিভিন্নভাবে তাকে চাপ ও হুমকি দিতে থাকেন। ২০২৩ সালের রমজান মাসে ওই নারী তার মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে সাভারের অরুণাপল্লীতে রনির নির্মাণাধীন একটি বাড়িতে ওঠেন এবং প্রতিবেশীদের কাছে নিজেকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। পরে বাড়িটি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলেও জিডিতে দাবি করেন তিনি। আবেদনে রনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ফারজানাকে বাড়ি ছেড়ে দিতে এবং বিয়ের কাবিননামা দেখাতে বলেন। ওই নারী বাড়ি ছেড়ে গেলেও কাবিননামা না দেখিয়ে দেনমোহর হিসেবে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। সামাজিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে তিনি ওই টাকা পরিশোধ করেন বলেও দাবি করেন রনি।
জিডিতে আরও বলা হয়, পরবর্তী সময়ে ফারজানা কয়েকবার ছেলে-মেয়েসহ তার অফিসে যান এবং তালাকসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দরকষাকষি করেন। তবে কাবিননামার কোনো প্রমাণ না দিয়ে তাকে সম্মানহানির হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রনি।
আবেদনে গত বছরের ২৮ জুনের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। রনির দাবি, ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে তিনি অফিসে থাকা অবস্থায় ফারজানা তার কক্ষে প্রবেশ করে অশালীন আচরণ শুরু করেন। তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান। পরে শাহবাগ থানা থেকে পুলিশের একটি দল এসে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে ওই নারীকে অফিস থেকে বের করে দেয়। রনি আরও দাবি করেন, ওই দিন পুলিশ ফারজানার কাছ থেকে কাবিননামার কোনো অনুলিপি সংগ্রহ করতে পারেনি। পরে তিনি বাসায় চলে যাওয়ার কথা বললেও পুলিশের সঙ্গে প্রতারণা করে ধানমন্ডিতে তার বাসায় চলে যান। এরপর নিউমার্কেট থানার কর্মকর্তারা উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং ফারজানার কাছ থেকে কথিত কাবিননামার একটি অনুলিপি সংগ্রহ করেন। সেই অনুলিপির একটি কপি তিনিও পান বলে জিডিতে উল্লেখ করেন।
কাবিননামাটির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রনি। তাঁর দাবি, কাবিননামায় ফারজানাকে অবিবাহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও তিনি আগে বিবাহিত ছিলেন। এ ছাড়া নিজের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি উল্লেখ না করা এবং প্রথম স্ত্রীর অনুমতিপত্র না থাকার বিষয়টিও জিডিতে তুলে ধরেন তিনি। এ ঘটনায় আইনি প্রতিকার চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। একই ফেসবুক পোস্টে রনি জানান, আইনজীবীদের পরামর্শে কথিত কাবিন অনুসারে তালাকের নোটিশ দেন এবং দেনমোহরের ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। তালাক কার্যকর ও রেজিস্ট্রি হওয়ার পর ওই নারী তার দাবিকৃত টাকা পেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
পোস্টে রনি লেখেন, ‘সময়টা ইউনূস জমানার। তখন ইল্লুদের প্রভাব তুঙ্গে ! ইল্লুর প্ররোচনায় স্ত্রী দাবি করা মহিলা হঠাৎ একদিন আমার অফিস এলেন। আমি ৯৯৯ এ ফোন করে পুলিশ ডাকলাম। পুলিশ এসে মহিলাকে বললো—আপনার কাছে কি আছে বিয়ের প্রমাণ। সে বললো কাগজ আছে। কিন্তু দেখালো না। কারণ ওটা নাকি আমার কাছে নেই। আমি যদি পাই তবে তাকে আইন মোতাবেক তালাক দিয়ে দিবো। পুলিশ তাকে অফিস থেকে নিয়ে গেলো। মহিলা নিচে নেমে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে চম্পট দিলেন। এরপর তিনি চক্রান্তের ২য় অংশ বাস্তবায়নের জন্য ধানমন্ডিতে আমার বাসায় উপস্থিত হলেন। আমি শাহবাগ থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে আসে। সেখানে মহিলার আত্মীয় পরিচয়ে ২ জন লোককে আনা হয় এবং থানার কর্তাব্যক্তিরা মহিলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার কাছ থেকে কথিত কাবিনের একটি কপি সংগ্রহ করতে সামর্থ হন। আইনবিদদের পরামর্শ ছিল — কাবিনটির যথাযথতা এবং কাবিনের আড়ালের ঘটনা কোর্ট কাঁচারিতে গিয়ে প্রমাণ করতে গেলে কয়েক বছর লাগবে এবং তারা চাচ্ছে আপনাকে কোর্টে নিয়ে জিম্মি করার জন্য। তারচেয়ে তাকে কাবিন অনুযায়ী তালাক এবং দেনমোহরের ১০ লাখ টাকা দিয়ে দিলে মন্দের ভালো হয় এবং চক্রান্তের ইতি ঘটে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমি পুরো ঘটনা বর্ণনা করে শাহবাগ থানায় মামলা করি, তালাকের নোটিস প্রদান করি এবং কথিত কাবিনে বর্ণিত টাকা পরিশোধ করি। স্ত্রী দাবি করা মহিলার লোকজন এরপর একাধিক বার যোগাযোগ করে এবং আমার সামাজিক সম্মানকে জিম্মি বিশাল বিশাল দাবি করতে থাকে। নিজেকে অটল রেখেছেন উল্লেখ রনি আরও বলেন, মহিলার বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করি নি তাঁর সাবেক স্বামীর ওরসে পয়দা হওয়া বিবাহ উপযুক্ত এবং কিছুটা মানসিক অসুস্থ মেয়ের এবং কিশোর ছেলের কথা চিন্তা করে।’
বিষয়টি সাবেক এই সংসদ সদস্যের পরিবার, আত্মীয় স্বজন এবং আপনজনরা ১ম দিন থেকেই জানতেন উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘কাজেই আমার মানসিক এবং নৈতিক শক্তি অটুট ছিলো এবং পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমার আপনজনরা সবাই আন্তরিকতা নিয়ে আমার পাশে দাঁড়ায়। এরই মধ্যে চক্রান্তের অংশ হিসাবে মহিলা এবং তার গডফাদার ইউটিউবার ইলিয়াস একটি ভিডিও তৈরী করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। বনি আমিন নামক আরেক ইউটিউবারকেও দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেয় মূলত আমাকে হেয় করার জন্য। ইতিমধ্যে, যেহেতু আইন মোতাবেক তালাক কার্যকর এবং রেজিস্ট্রি হয়ে যায় এবং মহিলা তার দাবিকৃত টাকা পেয়ে যায় সেহেতু বিষয়টি নিয়ে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









