সুবাইতা তার সাদা বিড়ালটাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চায় না। মিউ চোখের আড়াল হলেই সুবাইতা অস্থির হয়ে ওঠে। মিউ কোথায়? মিউ কোথায় গেল? এ ঘর, ও ঘর, বারান্দা, উঠান, সবখানে খুঁজে বেড়ায়। মিউ অবশ্য খুব বেশি দূরে যায় না। একটু পরেই হয়তো আলমারির নিচ থেকে গোল গোল চোখে মাথা বের করে বলবে—ম্যাঁও! ব্যস! মিউকে দেখামাত্রই সুবাইতার মুখ হাসিতে ঝলমল করে ওঠে।
সুবাইতা এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। তাই তার সারাদিনের কাজ বলতে পুতুলের বিয়ে দেওয়া, টিভিতে কার্টুন দেখা, মা-বাবাকে একটার পর একটা প্রশ্ন করা আর মিউকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো। অবশ্য এর কোনোটাই মিউকে ছাড়া হয় না। সুবাইতা যেখানে যায়, মিউও সেখানে যায়। সুবাইতা বারান্দায় বসলে মিউও পাশে বসে। সুবাইতা উঠানে গেলে মিউও পিছু নেয়। এমনকি সুবাইতা যখন মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে যায়, মিউও দরজার কাছে বসে অপেক্ষা করে। রাতে ঘুমানোর সময়ও
সুবাইতার পাশে মিউকে চাই। মা অনেক বুঝিয়ে বলেন, সুবাইতা, মিউ তো বিড়াল। ওকে পাশে নিয়ে ঘুমাতে হয় না।
সুবাইতা তখন গম্ভীর মুখে বলে, কিন্তু মিউ তো একা একা ঘুমাতে পারে না!
মা আর কী বলেন! শেষ পর্যন্ত সুবাইতা ঘুমিয়ে পড়লে মিউকে আলতো করে সরিয়ে দিতে হয়। আর মিউকে সরাতে গেলেই শুরু হয়—
ম্যাঁও! ম্যাঁও! ম্যাঁও! মনে হয়, মিউ যেন বলছে, আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? সুবাইতা তুমি কোথায়? আমাকে বাঁচাও!
সুবাইতা যখন এক বছরে পা দিয়েছিল, তখন থেকেই আশপাশে কোনো বিড়াল দেখলেই সে আনন্দে লাফিয়ে উঠত। তখনো ‘আম্মা’ ছাড়া খুব বেশি শব্দ স্পষ্ট করে বলতে পারত না। কিন্তু বিড়াল দেখলেই তার মুখে ফুটে উঠত একটি শব্দ—মিয়াও! মিয়াও!
বাবা-মাও মেয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলতেন, মিয়াও! মিয়াও! সুবাইতা তখন খিলখিল করে হাসত। হাত-পা ছুড়ত আনন্দে।
কোথাও কোনো বিড়ালের ডাক শুনলেই সে আবার সাড়া দিত—মিয়াও! মিয়াও! মনে হতো, পৃথিবীর সব বিড়ালের সঙ্গেই যেন তার গোপন বন্ধুত্ব আছে। কয়েক মাস পর আশপাশে ঘুরে বেড়ানো সেই বিড়ালটি দুটি বাচ্চার মা হলো। কিন্তু তিন দিনের মাথায় একটি বাচ্চাকে আর দেখা গেল না। অন্য বাচ্চাটি মাঝেমধ্যে সুবাইতাদের বাড়িতে আসতে শুরু করল।
ছোট্ট সুবাইতা বিড়ালছানাটিকে দেখলেই কখনো তার কান ধরে টানত, কখনো লেজের দিকে হাত বাড়াত, আবার কখনো কোলে নেওয়ার চেষ্টা করত। বিড়ালছানাটিও ধীরে ধীরে বুঝে গেল—এই বাড়ির মানুষগুলো তাকে ভয় দেখায় না। কেউ তাকে তাড়ায় না।
এই বাড়িটিই তার নিরাপদ আশ্রয়। এভাবেই একসময় সে সুবাইতাদের বাড়ির নিয়মিত বাসিন্দা হয়ে গেল।
আর সেই ছোট্ট সাদা বিড়ালটি হয়ে উঠল সুবাইতার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। তার নাম রাখা হয়েছিল—মিউ।
হাসির ব্যাপার হলো, সুবাইতা বাথরুমে গেলেও মিউ পিছু পিছু যেত। দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বাইরে বসে থাকত চুপচাপ। সুবাইতা বেশি সময় নিলে শুরু হতো—ম্যাঁও... ম্যাঁও...
একদিন বাবা মজা করে বললেন, মামনি, তোমার মিউ মনে হয় বাথরুমে যাবে। এতদিনে তো বেশ ভদ্র হয়েছে!
সুবাইতা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। এ্যা! ছিঃ বাবা! মিউ আবার বাথরুমে যাবে কীভাবে?
বাবা হেসে বললেন, কেন? মিউ কি মানুষ নয়?
সুবাইতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। না! মিউ তো বিড়াল!
এবার মা-ও পাশ থেকে বলেন, সুবাইতাকে তো আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করে দেব। তখন না হয় মিউকেও স্কুলে ভর্তি করে দেব। পড়াশোনা শিখে মিউ অনেক বড় হবে!
মায়ের কথা শুনে সুবাইতা বাবার দিকে তাকাল। তার মুখটা কেমন চিন্তিত হয়ে গেল। বাবা, দেখেছো আম্মু কী বলে? মিউ কীভাবে স্কুলে যাবে?
মেয়ের কথায় বাবা-মা দুজনেই হেসে উঠলেন।
আর মিউ?
সে তখন পাশেই বসে নিজের শরীর পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। মনে হলো, স্কুলে যাওয়ার কথা শুনে সে মোটেই খুশি নয়!
হঠাৎ গ্রামের বাড়ি থেকে এলেন দাদু। সবাইকে নিয়ে তিনি এবার গ্রামে বেড়াতে যাবেন। দাদুকে দেখে সুবাইতা খুব খুশি হলো। কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার কথা শুনতেই তার মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে গেল। গ্রামের বাড়ি অনেক দূর। যেতে হবে গাড়িতে। কিন্তু মিউকে নিয়ে যাবে কীভাবে? মিউকে ছাড়া তো সে এক পা-ও যেতে পারবে না! ছোট্ট সুবাইতা চুপচাপ বসে অনেকক্ষণ ভাবল। কাউকে কিছু বলল না। এদিকে দাদু নাতনিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন—সুবাইতা! দাদুভাই! কোথায় গেলে?
এক ঘর থেকে আরেক ঘর। বারান্দা, উঠান—সবখানে খুঁজলেন। কিন্তু সুবাইতার কোনো খবর নেই। শেষে গেটের কাছে গিয়ে দাদু দেখলেন, সুবাইতা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পাশে মিউ। দুজনেই যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো গোপন আলোচনা করছে।
দাদু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, কী হলো দাদুভাই? তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে তো আমি হয়রান!
সুবাইতা গাল ফুলিয়ে মাথা নিচু করে বলল, দাদু, আমি তোমার সঙ্গে যাব না।
দাদু অবাক হলেন। কেন দাদুভাই? কী হয়েছে?
সুবাইতা মিউয়ের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, মিউকে কীভাবে সঙ্গে নিয়ে যাব দাদু?
দাদু এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। এই জন্য এত চিন্তা?
সুবাইতা চুপ করে রইল। দাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তোমার মিউকেও আমরা সঙ্গে নিয়ে যাব। ওর জন্য গাড়িতে আলাদা একটা সিটের ব্যবস্থা করে দেব। তুমি যাবে আর মিউ তোমার সঙ্গে যাবে না—তা কি কখনো হয়?
সুবাইতার মুখ মুহূর্তেই হাসিতে ভরে উঠল। সত্যি দাদু?
একদম সত্যি!
পাশ থেকে মিউ তখন—ম্যাঁও! মনে হলো, সেও দাদুর কথায় সায় দিল।
সুবাইতা মিউকে কোলে তুলে নিল। তারপর দাদুর হাত ধরে বলল, চলো দাদু!
দাদু হেসে বললেন, চলো।
গাড়ি যখন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল, সুবাইতা জানালার পাশের সিটটা দেখে খুশিতে হাততালি দিল। তারপর মিউকে কোলে নিয়ে জানালার পাশে বসল। গাড়ি তখন ছুটে চলেছে গ্রামের পথে। সামনে গ্রামের পথ, সবুজ মাঠ, গাছপালা আর কত অচেনা আনন্দ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









