শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

জ্বালানি সংকটে বাড়ছে লোডশেডিং

তেলের জ্বালার মাঝে বিদ্যুতের ‘কষ্ট’

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১১ এএম

আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৫ এএম

তেলের জ্বালার মাঝে বিদ্যুতের ‘কষ্ট’

সারা দেশে কয়েকদিন ধরে বেড়ে চলছে লোডশেডিং। শহরাঞ্চলে তুলনামূলক কম হলেও গ্রামাঞ্চলে এরই মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে এমনিতেই জ্বালানি সংকট চলছে। তার ওপর কয়েকদিন ধরে গরমের প্রকোপ বেড়েছে। তাতে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদাও। এ ছাড়া কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তারা আরও বলছেন, এবার বিদ্যুৎ সংকট অতীতের চেয়েও বেশি হবে। 

এদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে উদ্ভূত জ্বালানি সংকটে ভর্তুকির বোঝা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে—এমন কারণ দেখিয়ে সরকার পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের পেশ করা একটি প্রস্তাব এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ০৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ এমন এক মুহূর্তে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে যখন দৈনিক বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে এক হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে—যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। 

বর্তমানে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ আছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনে এসে তিনি এ কথা জানান। অমিত বলেন, আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে এবং গর্বের সাথে বলতে পারি— বাংলাদেশের ইতিহাসে যেটি কখনোই হয়নি, বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি আমাদের মজুদ আছে। 

জানা গেছে—গ্রামেগঞ্জে, বিশেষ করে পল্লি বিদ্যুতের আওতায় থাকা এলাকাগুলোতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে-রাতে একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। আর প্রতিবার তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে গত তিন-চার দিন থেকে সারা দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩০ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ছে। আর জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। 

রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চার থেকে পাঁচ বার বিদ্যুৎ যায়। দিনে রাতে অর্ধেকের বেশি সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। একদিকে গরম যেমন বাড়তেছে, সেই সাথে লোডশেডিংও। যেদিন কম সেদিনও সাত ঘণ্টা, কোনদিন আবার ১০ ঘণ্টারও বেশি হয় লোডশেডিং। মেহেরপুরের আমঝুপির বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিবিসি বাংলার কাছে এই অভিজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন সেখানকার ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান লিটন। 

ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন চারদিন থেকে সারাদেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। দিন ও রাতের বড় একটা সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন জেলার পৌর এলাকার বাইরে যে সব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবারহ করে থাকে সে সব জায়গায় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারাও অবশ্য সেটি মানছেন। তারা বলছেন, কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩০ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ছে।  

তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের বড় একটি অংশের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় অঘোষিত লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এবং হাসপাতাল ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নোয়াখালীর ৯টি উপজেলার প্রায় সাড়ে ৯ লাখ গ্রাহক বর্তমানে চাহিদার তুলনায় নামমাত্র বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের মতে, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। চাটখিলের বাসিন্দা পলি আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ২৪ ঘণ্টায় আমরা বড়জোর ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। একবার বিদ্যুৎ আসার পর মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট থাকে, এরপরই আবার চলে যায়। দীর্ঘ এই লোডশেডিংয়ের ফলে একদিকে যেমন পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে জেনারেটর চালাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোরও অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে।  

প্রচণ্ড গরম, এর মধ্যে নেই বিদ্যুৎ—এই দুইয়ে মিলে কিশোরগঞ্জের জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। টানা তিন দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটছে জেলার পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের। টানা ৭২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ মানুষের। পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) রাতে হওয়া কালবৈশাখী জেলার বিভিন্ন স্থানে পল্লী বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছ পড়ে ছিঁড়ে গেছে তার, কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। ফলে তিন দিন ধরে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অন্ধকারে নিমজ্জিত। ফ্রিজে রাখা পচনশীল খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। চার্জের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে মোবাইল ফোনসহ জরুরি যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। সব মিলিয়ে আধুনিক জীবনযাত্রা এখন পুরোপুরি স্থবির। কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাভুক্ত কিশোরগঞ্জ সদর, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, নিকলী, বাজিতপুর, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার গ্রাহকেরা এই সংকটের মুখে পড়েছেন। 

গ্রাহকেরা বলেন, ‘দিনের বেলা তীব্র গরমে ঘরে থাকা দায়, আর রাতে অন্ধকারের কারণে বাড়ছে চুরি। ঝড়ের অজুহাতে এত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকা মেনে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, পয়লা বৈশাখের রাতে হওয়া ঝড়ে লাইনের ওপর গাছপালা পড়ে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সন্ধ্যায়ও ঝড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে মেইনটেন্যান্স (সংস্কারকাজ) পুরোদমে চলছে এবং আজকের মধ্যেই সব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হবে।

বৈশাখের শুরুতেই তীব্র দাবদাহে পুড়ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। প্রখর রোদ আর দমবন্ধ করা গরমে হাঁসফাঁস করছে জনজীবন। এ অবস্থায় দুর্ভোগ বাড়িয়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ সীমিত থাকায় লোড ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, ‌‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা এখন মানুষের সহনীয় সীমা অতিক্রম করছে। একসময় ফ্যানের বাতাসেই স্বস্তি মিলতো, এখন এসির বাতাসেও তেমন আরাম পাওয়া যায় না। সাতক্ষীরায় তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলোও বাধ্য হয়ে এসির দিকে ঝুঁকছে, যা আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এ অঞ্চলের আবহাওয়া অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যের মতো হয়ে উঠছে। ফলে শিশুদের মধ্যে ভাইরাসজনিত রোগ ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ঘন ঘন লোডশেডিং জনজীবনকে করে তুলেছে অসহনীয়। দিন-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শহর থেকে গ্রাম—সব শ্রেণিপেশার মানুষ।

শ্যামনগরের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, সেচের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ না পাওয়ায় জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে ফসল ক্ষতির মুখে পড়ছে। কৃষিকাজে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সোয়াইব হোসেন জানান, পিক আওয়ারে সাতক্ষীরায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে প্রায় ২২ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১৫-১৬ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় লোড ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে শহরের ১২টি ফিডারের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম মো. আজিজুর রহমান সরকার জানান, জেলায় তাদের মোট গ্রাহক ছয় লাখ ৪৭ হাজার ২৪ জন। বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৯৫ মেগাওয়াটের মতো। এতে গ্রাহকের পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার খুলনায় এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ঘাটতি ৩০০ মেগাওয়াট। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল প্রতি ঘণ্টায় এমনকি রাতেও লোডশেডিং হয়েছে, যার ফলে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ঢাকার গ্রামীণ এলাকায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) গ্রাহকেরাও প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে পড়েছেন।  

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সংকট তৈরি হওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কিছুটা কমছে। সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করে দ্রুত পুরোদমে উৎপাদন শুরুর চেষ্টা করছে সরকার। 

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারা দেশে লোডশেডিং এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, এই মাসের প্রথমার্ধে দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। 

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৪ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। সেই হিসেবে এই সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৬৮৮ মেগাওয়াট। পরদিন অর্থাৎ বুধবার বিকাল তিনটায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে এই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বুধবারের এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ চলতি মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। 

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েকদিনে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিছু মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাছাড়া জ্বালানি সংকটও রয়েছে। যে কারণে চাহিদা থাকলে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। 

পিজিসিবির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে সারা দেশের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। সেটা গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে শুরু করেছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ, অর্থাৎ ৮ এপ্রিলের পর থেকে সেটি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। প্রথম সপ্তাহে খুব সামান্য লোডশেডিং থাকলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে সেটি বেড়ে গড়ে ৭০০-৯০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। আর গত বুধবার থেকে সেটি বেড়ে ১,৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি হয়েছে। 

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে। 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত সময়ের বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি তেলের সংকটসহ নানা কারণে এবার গরমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশ খারাপের দিকে যেতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন। সেটির একটি সংকট আছে। এ ছাড়া গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট রয়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। 

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের কারণে কয়লা ও তেলের সাপ্লাই চেইনে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়লার জন্য আমাদের দুটি মেশিন আন্ডার লোডে চলছে। অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণেও উৎপাদন কমছে। 

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; তার লক্ষ্য ছিল সিস্টেম লস কমিয়ে আর্থিক চাপ লাঘব করা। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। পাশাপাশি এলএনজি, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপকরণগুলোর আমদানি খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কয়লা সরবরাহ বজায় রাখা এবং চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখার চেষ্টায় সরকারের ওপর আর্থিক বোঝার ভার দ্রুতই বেড়ে গেছে। বর্তমান বিদ্যুতের দাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রকৃত উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম, যার ফলে সৃষ্ট বিশাল ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন খরচ ছিল ১২ টাকা ৩৬ পয়সা, যেখানে পাইকারি বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ৭ টাকা ০৪ পয়সা। ফলে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও পিডিবিকে ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকায় আটকে রাখার পরিকল্পনা করা হলেও চলমান জ্বালানি সংকটে তা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রাথমিক জ্বালানির আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। 

সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়। তবে মন্ত্রিসভা কিছু বিষয়ে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সেটি ফেরত পাঠায় এবং কর্মকর্তারা বর্তমানে তা নিয়ে কাজ করছেন। পহেলা বৈশাখের আগে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় বিদ্যুতের ট্যারিফ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার জন্য।  

প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, পাইকারি দাম প্রতি ইউনিটে ৫০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা; এক টাকা বাড়ালে কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, সেই গ্রাহকদের জন্য খুচরা দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত ও সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইএমএফ অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রান্তিক গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভর্তুকির বোঝা কমানোর ওপর চাপ দিয়ে আসছে। প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে, গণশুনানি শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পেশ করা হবে। প্রস্তাবে শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির উদাহরণও টানা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.