বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

কাহিল বিদ্যুতের ঘাড়ে ‘রক্তচোষা দানব’

প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪০ এএম

আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪০ এএম

কাহিল বিদ্যুতের ঘাড়ে ‘রক্তচোষা দানব’

দেশে চলছে জ্বালানি তেলের ভয়াবহ সংকট। যানবাহন ছাড়িয়ে এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতেও। শুরু হয়েছে লোডশেডিং। গ্রামাঞ্চল তো বটেই, শহরাঞ্চলেও দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ ঘাটতি। এ অবস্থায় সরকারিভাবে যেখানে জ্বালানি সাশ্রয়ে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেখানে দেশের ভেতরেই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ নিঃশব্দে গিলে খাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। জ্বালানি সংকটে কাহিল হয়ে পড়া বিদ্যুতে যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এখন ‘রক্তচোষার’ ভূমিকা নিয়েছে এসব অটোরিকশা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে এই রিকশা চার্জ দিতে। যার সিংহভাগই দেওয়া হচ্ছে অবৈধ উপায়ে। একে বিশেষজ্ঞরা বলছেন জ্বালানি কিংবা অর্থনীতির এক ‘নীরব ক্যানসার,’ যা জাতীয় গ্রিডকে বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি বছরে চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশে ৬০ লাখের বেশি অটোরিকশা চলছে, যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই রয়েছে ১২ থেকে ১৫ লাখ। প্রতিটি রিকশায় ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে, যা পূর্ণ চার্জ হতে ৬-৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যয় হয়। মন্ত্রণালয় থেকে ৩ হাজার ৩০০টি বৈধ চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন থাকলেও এর চেয়ে বহুগুণ বেশি রয়েছে অবৈধ পয়েন্ট।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১০টি জোনের মধ্যে ৮টিতেই প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ রয়েছে। যারমধ্যে শীর্ষে রয়েছে রাজধানীর মিরপুর। এখানে ৩,৯৮৩টি চার্জিং পয়েন্ট ও ২৫৯টি অবৈধ গ্যারেজ রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য জোনের মধ্যে ওয়ারী, গুলশান, উত্তরা ও মতিঝিল এলাকায় হাজার হাজার অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে দিন-রাত ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিএসটিআই রোডের দুই পাশে ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য চার্জিং স্টেশন। সরাসরি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ‘হুক’ লাগিয়ে লাইন টেনে শত শত রিকশা চার্জ করা হচ্ছে। সাইফুল নামে এক গ্যারেজ কর্মী জানান, বৈধ মিটার নিতে বিপুল খরচ হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে অবৈধ লাইন ব্যবহার করছেন। একই চিত্র দেখা গেছে পশ্চিম ধানমন্ডি ও রায়ের বাজার এলাকায়, যেখানে একেকটি গ্যারেজে ১৮০টিরও বেশি রিকশা চার্জ হচ্ছে। 

এ বিষয়ে কথা হয় বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামানের সঙ্গে। সতর্কতার কথা জানিয়ে দৈনিক এদিনকে তিনি বলেন, ‘ঢাকার ২ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে ৫০০-৭০০ মেগাওয়াট যদি অটোরিকশাই নিয়ে নেয়, তাহলে সামনের গরমে ভয়াবহ লোডশেডিং ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’ 

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ এই পরিস্থিতিকে ‘ক্যানসার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ব্যাটারি আমদানি এবং স্থানীয় কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ঢাকাকে বাঁচানো কঠিন হবে।

ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মো. রবিউল হাসান এদিনকে জানান, অবৈধ চুরি ঠেকাতে তারা কিছু বৈধ স্টেশনের অনুমতি দিয়েছেন এবং নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। অন্যদিকে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ জানিয়েছেন, একটি নতুন বৈদ্যুতিক যানবাহন নীতি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং তিন চাকার যানের জন্য পৃথক নির্দেশিকা তৈরি করা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, শুধু নীতিমালায় কাজ হবে না; বিদ্যুৎ অপচয় রোধে প্রয়োজন কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান।

এদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে অটোরিকশার সংখ্যা। কোনো লাইসেন্স কিংবা নাম্বার প্লেট না থাকায় এসব অটোরিকশার সংখ্যাও নিরূপণ করা যাচ্ছে না। রাজধানীর অলিগলি শুধু নয়, মূল সড়কেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব অটোরিকশা। এমনকি ছড়িয়ে পড়েছে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা কিংবা গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে। বেপরোয়া গতির এসব অটোরিকশায় বাড়ছে দুর্ঘটনা। একটি পরিবহন কীভাবে অনুমোদন ছাড়াই সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল তা জনমনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। এখন লাগাম টানতেও পারছে না সরকার কিংবা সরকারের নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ।

এর আগে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ঢাকা মহানগরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে আন্দোলন করে অটোরিকশা চালকরা। আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও সড়ক থেকে অবৈধ অটো সরানোর সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে তারা তীব্র আন্দোলন, সড়ক অবরোধ এবং ভাঙচুর চালায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের ফলে তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ তৈরি হয়, যার প্রেক্ষিতে চালকরা দাবি আদায়ে সরকারকে আল্টিমেটাম দেয়। পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্যও এই খাতের নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তোলে। সরকার অটোরিকশাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় এনে পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নেয়, তবে তীব্র আন্দোলনের মুখে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ বা বিলসের এক গবেষণা থেকে জানা গেছে, মোট অবৈধ রিকশার সংখ্যা একেবারেই ধারণার ওপর নির্ভর করে বলা হচ্ছে। সংখ্যাটা আরো বেশিই হবে। রিকশার ওপর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ কখনোই ছিল না। দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৫ লাখের বেশি রিকশা চলাচল করছে। ৩ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশাও চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা অবৈধ রিকশা রাস্তায় নামানোর জন্য প্রধানত দায়ী।

ট্রাফিক আইন ও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে বাধাহীনভাবে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। শুরুতে এদের নিয়ন্ত্রণ না করায় এরা হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। রাজধানীর সড়কে এদের নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) প্রধান রুটগুলো থেকে এসব যান সরানোর পরিকল্পনা করেছিল। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বৈদ্যুতিক বাস সেবা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। যত্রতত্র চার্জ দেওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চার্জিং স্টেশনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে অটোরিকশা চালকরা জোটবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামে।

রাজধানীর মূল সড়কে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলের কারণে বিপদে পড়ছে দ্রুতগতির গাড়ি। গণপরিবহন ও প্রাইভেটকার হারিয়েছে তাদের স্বাভাবিক গতি। প্যাডেলচালিত রিকশাগুলোও কোণঠাসা হয়ে পড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার চাপে। রাজধানীতে এখন বিক্রি বেড়েছে এসব অটোরিকশার। ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় কিনে যেমন অনেকে বেকারত্ব ঘোচাচ্ছেন, তেমনি তৈরিতে সম্পৃক্ত অনেকে। তাই বন্ধ না করে নীতিমালার আওতার আনার দাবি করছেন অনেকেই। এ বিষয়ে পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ঢাকায় বৈধ-অবৈধ মিলে চলাচল করছে প্রায় ১৫ লাখ রিকশা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসন অভিযান না চালানোর কারণে দিন দিন বাড়ছে অবৈধ অটোরিকশা কারখানার সংখ্যাও। কম বিনিয়োগে অধিক মুনাফার আশায় এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মহল্লায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে এই রিকশার সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। যার মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ। সারা দেশে দৈনিক এসব রিকশা ব্যবহার করেন ১১ কোটির বেশি মানুষ। তবে, অটোরিকশার এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সমান্তরালভাবে বেড়েছে বিশৃঙ্খলা। নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও টাকা জমিয়ে দুই-চারটি রিকশা কিনে সড়কে নামাচ্ছেন।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা, কেরানীগঞ্জ, বেড়িবাঁধ, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, কমলাপুর, তেজগাঁও, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায়, মূলত পাড়া-মহল্লাগুলোয় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য ওয়ার্কশপ। চীন থেকে আমদানি করা ব্যাটারি, মোটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে তৈরি চাকা, বসার সিট, রিকশার বডি যোগ করে এসব যান তৈরি করা হয়। অটোগুলোর কোনোটি চিকন চাকার, কোনোটির চাকা মোটা। কোনোটির কাঠামো লোহার, কোনোটিতে লোহার কাঠামোর সঙ্গে ওপরে বেতের ছাউনি। কোনোটি শুধু পায়ে-চালিত রিকশার মধ্যেই মোটর লাগিয়ে অটোতে রূপান্তর করা হয়েছে, কোনোটিতে আবার কাঠামো পরিবর্তন হয়েছে।

ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা ও কমলাপুর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মেরামত ও বিক্রির কারখানা পাওয়া গেছে। তেজগাঁও এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্রেতা সেজে বিভিন্ন দোকান ও রিকশার মালিকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ওই এলাকার অনেক জায়গায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ছোট-বড় গ্যারেজের খোঁজ পাওয়া গেছে। আশপাশের এলাকা যেমন মগবাজার, হাতিরঝিল সমগ্র তেজগাঁও এলাকাসহ মহাখালী এলাকার অটোরিকশাগুলো এখানে মেরামত করা হয়। ওইসব এলাকার রিকশাচালকরা জানান, তেজগাঁও, মুগদা মিরপুর এলাকায় এ ধরনের রিকশার গ্যারেজ রয়েছে। তবে তেজগাঁওয়ে আশপাশের এলাকার রিকশা কেনাবেচা হয়ে থাকে।

ঢাকায় সবচেয়ে বড় অটোরিকশা বিক্রয়ের মার্কেট খুঁজে পাওয়া গেল কমলাপুর এলাকায়। কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম গ্যালারির পেছনেই গড়ে উঠেছে রিকশা বিক্রির বিশাল মার্কেট। স্টেডিয়ামের মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, বিভিন্ন দোকানের সামনে খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে অটোরিকশা। স্টেডিয়াম মার্কেটের সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি হচ্ছে, মিস্ত্রিরা লোহা ঝালাইয়ের কাজ করছেন। মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, কেউ রিকশার বডি তৈরি করছেন আবার কেউ ব্যাটারি ফিটিং করছেন।

ঢাকার আশপাশের জেলা নরসিংদী, গাজীপুর এলাকা থেকে সরাসরি তৈরি হওয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলে আসে ঢাকায়। বড় ট্রাকে করে এসব ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। কিছু রিকশা সরাসরি আসে না। সেসবের পার্টস আমদানি করতে হয়। আমদানীকৃত পার্টস ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলার দোকানে দোকানে বিক্রি হচ্ছে। কেউ পার্টস কিনে নিয়ে অর্ডার করে রিকশা তৈরি করেন, কেউ রেডিমেড রিকশা কিনে নেন।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় কয়েকজন অটোরিকশা গ্যারেজের মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায় ভিন্ন রকমের তথ্য। তাদের কেউ বলছেন, প্রশাসনের কড়া নজরদারি বা তদারকি না থাকার কারণে অবৈধ এসব চার্জিং পয়েন্টকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ। রাস্তার বৈদ্যুতিক খুঁটি বা বাসাবাড়ি থেকে নেওয়া এসব অবৈধ ইলেকট্রিক লাইন থেকেই বাড়ছে ব্যাটারি রিকশার গ্োরেজের রমরমা ব্যবসা। আবার কেউ কেউ দোষারোপ করছেন সরকারকে। তারা বলছেন, সরকার চায়না বা বিদেশি এসব ব্যাটার আমদানি বন্ধ করলেই বন্ধ হবে দেশের বিদ্যুৎ ধ্বংসকারী এসব ব্যাটারি চালিত যানবাহন।

ব্যাটারিচালিত রিকশা গ্যারেজের মালিক রবিন। কয়েক বছর হলো গ্যারেজের ব্যবসা করেন তিনি। জটিল প্রক্রিয়ার কারণে বৈধ বৈদ্যুতিক লাইনের সংযোগ না পেয়ে শুরুতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ মানে বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন থেকে ব্যাটারি রিকশা চার্জিং ও গ্যারেজের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। পরে দেশের জ্বালানি খাত সংকট, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ বা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে তুমুল আলোচনা হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযানে তিন লাখ টাকা জরিমানা, গ্যারেজ বন্ধ, মামলা প্রদান ও গ্যারেজের রিকশার ব্যাটারি, চার্জার সব নিয়ে যায়। এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে এক লাখ টাকা নগদ প্রদান এবং বাকি দুই লাখ টাকা কিস্তিতে পরিশোধের চুক্তিতে মামলা এখনো তার নামে চলমান। আইনি জটিলতার অবসান কবে ঘটবে, তা জানেন না তিনি। তবে আইনজীবীর মাধ্যমে মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ এলাকায় ডিপিডিসি (ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড) অফিস থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জিং ব্যবসার জন্য বৈধ বৈদ্যুতিক মিটার সংযোগের অনুমোদন নিয়ে আবার ব্যাটারি রিকশা চার্জিং গ্যারেজের ব্যবসা সচল করেন রবিন। ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযানে দীর্ঘদিন ব্যাটারি রিকশা চার্জিং গ্যারেজ বন্ধ থাকায় এখন ব্যাটারি রিকশার পরিমাণ কম তবে আগামীতে পরিমাণ বাড়বে । যেহেতু রিকশা কম আর বৈধ সংযোগ পেয়েছেন এক সপ্তাহ হলো তাই প্রতিমাসের সঠিক বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ জানাতে পারেননি তিনি। আনুমানিক প্রতিদিন একটি ব্যাটারি রিকশা চার্জের পেছনে ৪০ টাকা  বা প্রায় ৪ ইউনিট বিদ্যুৎ এর প্রয়োজন হয়।

ব্যাটারি রিকশা বন্ধ নাকি নিয়ন্ত্রণ এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যাটারি রিকশা গ্যারেজের মালিক  মো. ইসমাইল বলেন, আমরা চাই সঠিক ও বৈধ প্রক্রিয়াই ব্যাটারি রিকশা গ্যারেজ পরিচালনা করতে। কিন্তু অটোরিকশা বন্ধের প্রক্রিয়ায় গেলে পুরো ঢাকা শহর অচল হয়ে যাবে। পায়ে চালিত রিকশা এখন পরিমাণে অনেক কম। যদিও পায়ে চালিত রিকশা থাকে তা হলেও কষ্টের কারণে মানুষ এখন এমন রিকশায় উঠতে চায় না। সেখানে অটোরিকশা  সময় এবং টাকা বাঁচাতে অত্যন্ত সহজলভ্য বাহন। যেখানে পায়ে চালিত রিকশার ভাড়া ৮০ টাকা সেই একই পথ ব্যাটারি রিকশা চলছে ৪০ থেকে ৬০ টাকায়। এ ছাড়া অফিস টাইমে তাড়াহুড়ার কারণে এখন অনেকেই দ্রুততম এই বাহন ব্যবহার করছেন। প্রযুক্তির এই যুগে সহজলভ্য কাজ বাদ দিয়ে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে অমানবিকভাবে টেনে নিয়ে যাবে কেন? এমন অমানবিক কাজ থেকে সবাইকে বিরত থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি। সেই সাথে ব্যাটারি রিকশার সিস্টেম আপডেটের কারণে কর্মসংস্থান বাড়ছে  ও যাতায়াত সহজ হয়েছে। আর যারা অবৈধভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে বা ব্যাটারি রিকশা চালাচ্ছেন এটা নিয়ন্ত্রণের দায়ভার প্রশাসনের। প্রসাশন কঠোর হলে সবকিছুর  সমাধান।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হক এদিনকে জানান, জনবহুল এই নগরীতে পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকার কারণেই অবৈধ রিকশা বেড়েছে। রিকশার কারণে অন্যান্য যানবাহনের গতি কমে যানজট হচ্ছে। বহু মানুষ এই পেশায় জড়িত। তাই রিকশা তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিকশা চলাচলে সুষ্ঠ‍ু ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সবাইকে ভাবতে হবে।

রাজধানীতে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর ব্যাটারিচালিত রিকশা বেড়েছে বলে জানান ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাসরুর। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অনেক ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। কিন্তু সরকার হয়তো কোনো একটা দিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক ও মালিকদের কিছুটা ছাড় দিয়েছে। এর ফলে এটা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি করছে উল্লেখ করে ফাহিম মাসরুর বলেন, অনেকেই সাময়িক বেকারত্ব কাটাতে এই পেশায় যুক্ত হন। তাই তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিতের পাশাপাশি পুরো খাতটিকে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় নিয়ে আসতে হবে।

কোন আইনে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা?
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বর্তমানে একটি আলোচিত-সমালোচিত বাহন। এর সুবিধাও যেমন আছে, তেমনই রয়েছে নানা বিতর্ক। তবে এই রিকশা এখনো কোনো নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আসেনি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কিংবা বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ)— কোনো পক্ষই এ যানবাহনের দায়িত্ব নিচ্ছে না। এদিকে সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান না দিয়ে হাইকোর্ট থেকে একাধিকবার ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ে সিটি করপোরেশন ও বিআরটিএ’র দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা সড়ক ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা বলছে, তারা কেবল পায়ে-চালিত রিকশার লাইসেন্স দিয়ে থাকে এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তাদের আওতার বাইরে। অপরদিকে, বিআরটিএ বলছে, তাদের তালিকায় এমন যানবাহনের কোনো জায়গা নেই। তাদের দায়িত্ব শুধু সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন প্রদান করা। ফলে এই রিকশা নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলায় আনতে কোনো উদ্যোগ নেই কোনো পক্ষেরই।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক এদিনকে বলেন, একসময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার জন্য কিছু আবেদন আহ্বান করেছিল। তখন ব্যাটারি রিকশার অনুমোদনের জন্য কিছু বড় বড় কোম্পানি আবেদন করেছিল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। তিনি আরো জানান, প্রায় ২০০ আমদানিকারক এবং ৫টা শিল্প গ্রুপ এটার সাথে জড়িত।

হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নেও ব্যর্থতা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের জন্য হাইকোর্ট থেকে একাধিকবার নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু চালক ও শ্রমিক সংগঠনের বিরোধিতার কারণে এই নির্দেশনা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। বরং সরকারের উদ্যোগের অভাবে এই রিকশার সংখ্যা ও কার্যক্রম দিন দিন আরো বেড়ে চলছে। কেবল হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্যই নয়, ট্রাফিক আইনেরও তোয়াক্কা করছেন না এই অটোরিকশার চালকরা। এ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই রাজধানীবাসীর। তারা বলছেন, অটোরিকশা মন্দ না। তবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলার কারণে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটছে। পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও এদের কারণে সাবলীল চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ৫৬% যাত্রী
রাজধানীতে বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল। এতে যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে বাহনটিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন ৫৬ দশমিক ৬০ শতাংশ যাত্রী। পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন ২১ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর ৩৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ যাত্রী গলির সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। সম্প্রতি এক গবেষণায় এ তথ্য দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন। গবেষণার প্রধান ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সরোয়ার। তিনি জানান, সম্প্রতি রাজধানীর ৩৮৪ জন রিকশাচালক, ৩৯২ জন যাত্রী ও ৬৩টি গ্যারেজের মালিকের মতামতের ভিত্তিতে ‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’ নামে এ গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, রাজধানীতে চলাচল করা বেশির ভাগ রিকশার নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ আর প্যাডেল রিকশার ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশের কোনো নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের ৭৫ শতাংশেরই আগে রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। এই পেশায় যারা আসছেন, তারা তুলনামূলক তরুণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ যাত্রী যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যাত্রীদের কাছে প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুততর, কম ভাড়া ও সহজলভ্য মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন ৩০ শতাংশ যাত্রী। প্যাডেল রিকশায় এ ঝুঁকির কথা বলেছেন ১৮ শতাংশ যাত্রী। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ মনে করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে শহরে যানজট বেশি হচ্ছে। ৩৪ শতাংশ যানজটের জন্য প্যাডেল রিকশাকে দায়ী করেছেন। আর ৪ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, সব রিকশাই যানজটের জন্য দায়ী। তবে যানজটের জন্য শুধু রিকশাই দায়ী বলে মনে করেন না ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার মো. সেলিম খান। আলোচনা সভায় তিনি বলেন, রিকশা হয়তো কিছুটা দায়ী। কিন্তু সড়কের পাশে ও ফুটপাতে যেসব অবৈধ দোকান বা স্থাপনা গড়ে উঠেছে, সেগুলো যানজটের মূল কারণ। 

রাজধানীতে প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চললেও কোথাও পার্কিংয়ের স্থান নেই বলে অভিযোগ করেন সেলিম খান। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে এসব রিকশা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকে। চাপ পড়ে পুলিশের ওপর। তিনি সিটি করপোরেশনকে সড়কে রিকশা দাঁড়ানোর জন্য জায়গা চিহ্নিত করে দেওয়ার (মার্কিং লাইন) পরামর্শ দেন। গবেষণায় বলা হয়, ব্যাটারিচালিত রিকশার ৭৯ শতাংশ আর প্যাডেল রিকশার ৬৫ শতাংশই চালকদের নিজের নয়। চালকদের ঋণের বোঝাও বেশি। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের গড় ঋণের পরিমাণ ৭৯ হাজার ৯২৭ টাকা। আর প্যাডেল রিকশার চালকদের গড় ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৬৫৪ টাকা।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.