দেশে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে অস্থির হয়ে উঠেছে পরিবহন খাতসহ নিত্যপণ্যের বাজার। সরকার গত রবিবার থেকে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে নতুন দর কার্যকর করেছে। একই সঙ্গে চলতি মাসে দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ানো হয়েছে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম, যার ফলে ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকায়। আর জ্বালানির দাম বাড়ানোর এই সুযোগ নিতে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিচ্ছে একশ্রেণির মুনাফাখোর। যারা শুধু জ্বালানির ব্যবসায় নয়, জড়িয়ে আছে নিত্যপণ্যসহ সব ধরনের ব্যবসাতেই। নিরুপায় জনসাধারণের ‘গলা কাটতে’ তারা রীতিমতো ছুরিতে শান দিচ্ছে।
পরিবহন ভাড়া বাড়ানো শুরু
জ্বালানির এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পরপরই রাজধানীমুখী পণ্য পরিবহনে ট্রাকভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে বর্ধিত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও চলছে মালিক-শ্রমিকদের দর-কষাকষি। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ দেশের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, তেলের দাম বাড়ায় পূর্বের নির্ধারিত ভাড়ায় গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আর এ খাত সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও এক দফা বাড়বে।
দৈনিকের এদিনের হাতে আসা তথ্যে জানা যায়, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক রুট ঢাকা-চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহন ব্যয় এরই মধ্যে কয়েক দফা বেড়েছে। চট্রগ্রাম আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির তথ্যমতে, সাধারণ সময়ে এই রুটে যে ভাড়া ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা ছিল, সাম্প্রতিক জ্বালানিসংকটে তা বেড়ে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে বাড়তি ভাড়া কার্যকরের পর এই খরচ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন মালিক পক্ষ জানিয়েছে, তেলের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে আগামীতে ভাড়ার নতুন স্তর নির্ধারিত হবে।
দৈনিক এদিনের উত্তরবঙ্গ প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ও সবজি সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতেও ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় চালের ট্রাকভাড়া এরই মধ্যে ট্রাকপ্রতি অন্তত দেড় হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির মতে, পরিবহন খরচ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, বগুড়ার মহাস্থান হাটের সবজি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সোমবার থেকে ঢাকা অভিমুখে ৫ টনের ট্রাকের ভাড়া ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি দাবি করছেন মালিকরা।
পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির এই প্রবণতা বাজারে এক ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাকমালিকরা বর্ধিত ভাড়া দাবি করলেও ব্যবসায়ীরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। ফলে পণ্য লোডিং ও খালাস প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিচ্ছে। বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হওয়া নিয়ে মালিক ও আড়তদারদের মধ্যে দরকষাকষি চললেও শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা সাধারণ ভোক্তার কাঁধেই পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বাজার বিশ্লেষকরা।
বাসের পর এবার লঞ্চভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব
জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির ঝাপটা এসে লেগেছে দেশের নৌ-যোগাযোগ খাতে। বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া পর্দার আড়ালে চলমান থাকলেও, যাত্রী সাধারণের পকেটে সরাসরি কামড় দিতে এবার বড় অংকের প্রস্তাব নিয়ে মাঠে নেমেছে লঞ্চ মালিকরা। কোনো রাখঢাক না করেই বর্তমান লঞ্চভাড়া এক লাফে ৪২ শতাংশ বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে পাঠানো এই প্রস্তাব একদিকে যেমন মালিকদের টিকে থাকার লড়াইকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদের কপালে ফেলেছে দুশ্চিন্তার চওড়া ভাঁজ।
নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, বলছে খোদ সরকার
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কষাঘাতে পিষ্ট সাধারণ মানুষের জন্য আরো দুঃসংবাদ নিয়ে এলো খোদ সরকার। বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে এবার সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়বে নিত্যপণ্যের দাম। সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সরাসরি এই পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের সাথে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ইঙ্গিত দেন। সরকারের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগকে বাস্তবমুখী সমন্বয় বলা হলেও, মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কেন পণ্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির পরিকল্পনা? তা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সরকারি পূর্বাভাসকে অর্থনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের জন্য একটি দ্বিমুখী সংকট হিসেবে দেখছেন। অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞ ড.তৌফিক আহমদ চৌধুরী দৈনিক এদিনকে বলেন, মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও সরকারিভাবে দাম বাড়ার আগাম ইঙ্গিত অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ তৈরি করেছে। এ অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ঘোষণায় পর সব ব্যবসায়ীরা দু’দফায় দাম বৃদ্ধির করবে । ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থবিরতা নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ সময় ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী আরো বলেন, মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল নিত্যপণ্যের সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পোশাক, প্রসাধন ও শিক্ষা উপকরণের দামকেও উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় লোডশেডিং মোকাবিলায় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন খরচ আর কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা হয়েছে।
ঘোষণার পরই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বাড়বে এমন ঘোষণায় অস্থির হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজার। গতকাল বিকেলে রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়। বাজারে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখী। ডালসহ প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের দাম আরো এক দফা বাড়তে পারে বলছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও রেকর্ড ছাড়ানোর আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন এদিনকে বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজারের কৃত্রিম সংকট নিয়ন্ত্রণ ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি, নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে আপাতত জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে জানা যায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি রুখতে এবং বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ৫টি সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। স্বল্পমেয়াদে দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে বাজার তদারকিতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ, পণ্য সরবরাহ চেইন সচল রাখা ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, টিসিবি ও ওএমএস-এর মতো ভর্তুকিযুক্ত বিক্রয় কার্যক্রম সম্প্রসারণ, আমদানি সহজীকরণে ডলার সংকট নিরসন এবং উৎপাদন খরচ কমাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। গতকাল কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রুখতে টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠকে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে নিয়ে সমন্বিত মনিটরিং জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









