বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

লিমন-বৃষ্টির পরিবারে বহমান অশ্রুধারা

প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪১ এএম

আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪১ এএম

লিমন-বৃষ্টির পরিবারে বহমান অশ্রুধারা

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ গুম করে খুনি। লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য পেয়েছে  পুলিশ। লিমনের লাশ পাওয়া গেলেও এখনও হদিস মেলেনি বৃষ্টির মরদেহের।ঢাকায় বসবাসরত বৃষ্টির স্বজনরা জানান, ক্রাইমসিনে রক্তের পরিমাণ দেখে পুলিশের ধারণা দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য পরিবারের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। রাজধানীর মিরপুরের বাড়ি থেকে মাত্র এক বছর আগে বিদায় নিয়েছিলেন নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। কে জানত, উচ্চশিক্ষার সেই যাত্রা আর কোনোদিন ঘরে ফেরার পথ খুঁজে পাবে না!

যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমন। তদন্তে নেমে লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার দেয়া তথ্যে, ১০ দিন পর হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতু এলাকা থেকে লিমনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। তবে এখনও হদিস মেলেনি বৃষ্টির। বৃষ্টির মৃত্যুসংবাদ পৌঁছানোর পর থেকে মিরপুরে বৃষ্টির পরিবারের বাড়িতে থমকে আছে সময়। বাবা-মায়ের স্বপ্নপূরণ করতে যাওয়া মেয়ের ফিরে আসার পথ চেয়ে থাকা চোখ দুটো এখন কেবল অশ্রুসজল। বন্ধু ও স্বজনরা এসে ভিড় করছেন বাড়িতে, কিন্তু কেউ এই নিষ্ঠুর সত্য মেনে নিতে পারছেন না। বৃষ্টির মামা জানান, ক্রাইমসিনে রক্তের পরিমাণ দেখে মার্কিন পুলিশের ধারণা সেখানে বৃষ্টিও ছিল। এজন্য পরিবারের ডিএনএ নমুনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে, লিমনের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জের লালডোবায়। তার হত্যার খবরে আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে লিমনের স্বজনসহ এলাকাবাসী।

জামিল আহমেদ লিমন এবং নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডির শিক্ষার্থী। জামিল ইউএসএফের ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডির শিক্ষার্থী। আর নাহিদা কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারং এর শিক্ষার্থী। তাদের দুজনকে সবশেষ ১৬ এপ্রিল দেখা গিয়েছিল।

বাবার একটাই চাওয়া
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে হত্যার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ এখনো খুঁজে পায়নি বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা জহির উদ্দিন আকন ওরফে দিল মোহাম্মদ। তাঁর একটাই চাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন মেয়ের লাশ খুঁজে বের করে এবং বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায়। তাঁর বাবা জহির উদ্দিন দুই যুগের বেশি সময় ধরে রাজধানীর মিরপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর মেয়ে নাহিদা সুলতানা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) পিএইচডির শিক্ষার্থী ছিলেন।

গতকাল রবিবার নিহত বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মেয়েটাকে আমি শেষবারের মতো দেখতে চাই। বৃষ্টির মা, ভাই সবাই খুব মন খারাপ করে আছে। কান্নাকাটি করছে। সবার মন মরা। এ অবস্থায় আমাদের একটাই আকুতি। ওর মরদেহটা যেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজে বের করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। আমরা এর বাইরে আর কিছু চাই না।’ জহির উদ্দিন আকন বলেন, ‘মেয়ের লাশ পাওয়ার খবরের আশায় শনিবার রাত জেগে অপেক্ষা করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ আর ফোন করেনি। তাদের ফোন করার কথা ছিল। পরে আমরা যোগাযোগ করে জেনেছি, তারা (পুলিশ) এখনো বৃষ্টির মরদেহ খুঁজতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পুলিশ লিমনের বাসা থেকে একটি দেহের খণ্ডিত অংশ পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি বৃষ্টির দেহের অংশ। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত বৃষ্টির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি দূতাবাস, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে পুলিশসহ যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটি যোগাযোগ রাখছে। আশ্বস্ত করেছে, বৃষ্টির হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতসহ তার লাশটি খুঁজে পেতে তারা সহযোগিতা করবে। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করতে পারছি না।’

বৃষ্টির পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মিরপুরের নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে ২০১৪ সালে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এসএসসি পাস করেন নাহিদা সুলতানা। পরে শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকেও জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে ঢাকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। তবে স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পেলে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বৃষ্টি।

শেষবার কোথায় দেখা গিয়েছিল দুজনকে
যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই ডক্টরাল শিক্ষার্থীই ছিলেন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ গবেষক। তাদের দু’জনকে শেষ কোথায় দেখা গিয়েছিল তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। প্রতিবদেন অনুসারে, জামিল লিমনকে সবশেষ গত ১৬ এপ্রিল সকালে টাম্পায় সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় তিন ব্লক দূরে তার বাড়িতে দেখা গিয়েছিল।নাহিদা বৃষ্টিকে সবশেষ একইদিন সকালে ক্যাম্পাসের প্রকৃতি ও পরিবেশ বিজ্ঞান ভবনে দেখা যায় বলে জানিয়েছে সিএনএন। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদের উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, বৃষ্টি ও লিমন দু’জনেই ছিলেন ২৭ বছর বয়সি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি ডক্টরাল শিক্ষার্থী, যাদের শুরুটা হয়েছিল বন্ধু হিসেবে এবং সময়ের সাথে সাথে একে অপরের প্রতি অনুভূতি তৈরি হয়—এমনকি তারা বিয়ের কথাও ভাবছিলেন। জুবায়ের আহমেদ শনিবার (২৫ এপ্রিল) সিএনএন-কে টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে জানান, দয়া করে আমার প্রিয় ভাইকে আপনাদের দোয়ায় রাখবেন। এদিকে মার্কিন তদন্তকারী সংস্থার ধারণা, বৃষ্টিকে হত্যার পর তার দেহ কয়েক টুকরো করে নদীতে ফেলা দেয়া হয়েছে। 

লিমন ও বৃষ্টিকে হত্যায় অভিযুক্ত হয়েছে লিমনের রুমমেট ফিলিস্তিনী বংশোদ্ভূত হিশাম আবুঘরবেহ। তদন্তকারী সূত্রগুলো বলছে, হিশাম শুরুর দিকে পুলিশকে সহযোগিতা করলেও এখন মুখ খুলছে না। শনিবার ফ্লোরিডার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের অফিস জানিয়েছে, অভিযুক্ত হিশামের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দু’টি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এমন হত্যাকে ‘ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার’ বলে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তারা অভিযুক্ত হিশামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস ও ফ্লোরিডা কনস্যুলেট। মার্কিন গণমাধ্যমও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের খবর।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.