বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

অরক্ষিত ঢাকা রেকর্ডরুম

‘বালামখেকো আবিদ’

আপেল মাহমুদ

প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৬ এএম

আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৬ এএম

‘বালামখেকো আবিদ’

একটি বালাম বা ভলিউম বইয়ের পাতায় ভূমি মালিকদের ভাগ্য লেখা থাকে। তাদের বাড়িঘর, জমিজমা ও পুকুর-নালার দলিলের মাস্টারকপি হলো বালাম বই। এর পাতা ছেঁড়া মানে তার বিষয়-সম্পত্তির স্বত্ব কেড়ে নেওয়া। এমন গুরুতর অপরাধ করে বেড়াচ্ছেন ঢাকা জেলা রেকর্ডরুমের উমেদার এলাহি খোরশেদ আবিদ। বালাম বইয়ের নির্দিষ্ট পাতা ছিঁড়েই বর্তমানে তিনি কোটিপতি। আর এই অবৈধ কাজগুলো তাকে সরবরাহ করে থাকেন দলিল জালিয়াত চক্রের দুই হোতা রেজিস্ট্রি অফিসের দালাল গোলাম কিবরিয়া স্বাধীন ও রুবেল মাতবর। প্রথমজন নিজেকে পরিচয় দেন বিএনপি নেতা বলে, দ্বিতীয়জন যুবলীগ নেতা।

রেকর্ডরুমে কর্মরত একাধিক কর্মচারী অভিযোগ করেন, এ পর্যন্ত আবিদ বালামের কতগুলো পাতা ছিঁড়েছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তবে এমন অপকর্ম করতে গিয়ে তিন-চারবার হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। যার কারণে তার নাম ‘বালামখেকো আবিদ’ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি মোটা অংকের টাকা খরচ করে পার পেয়ে যান।

গত ১৯ এপ্রিল তিনি জালিয়াতচক্রের সঙ্গে যোজসাজশ করে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের একটি দলিলের পাতা ছিঁড়ে ফেলেন। দলিল নম্বর ৬৮০৪। যে দলিলটি ১০৩ নম্বর ঢাকার বালাম বইয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

রেকর্ডরুম সূত্র জানায়, জালিয়াতরা অন্যের জমি আত্মসাৎ করার প্রথম কৌশল হিসেবে দলিলের মাস্টারকপি বালামের পাতা ছিঁড়ে ফেলে। তারপর জাল দলিল সৃষ্টি করে সেই জমি দখল করে নেয়। যে জমির বাজার মূল্য ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই চক্রের সদস্য হিসেবে আবিদ ২০-২৫ লাখ, কখনো ‘কেস’ অনুযায়ী কোটি টাকার বিনিময়ে বালাম বইয়ের পাতা ছিঁড়ে থাকেন। শুধু পাতা ছেঁড়া নয়, বালামে ঘষামাজা করে জমির পরিমাণ কমবেশি করা কিংবা দলিলের দাতা-গ্রহীতার নামও পরিবর্তন করে থাকেন।

রেকর্ডরুমের উমেদার আবিদের এমন গুরুতর অপরাধের কথা রেকর্ডরুম সাব-রেজিস্ট্রার মাহবুবুর রহমান অকপটে স্বীকার করে এদিনকে বলেন, ‘এই ছেলেটি দাগী অপরাধী। শুধু এবার নয়, এর আগেও বালামের অনেক পাতা ছিঁড়েছে। ফলে অনেক জমির মালিক সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। তাই এবার বালামের পাতা ছেঁড়ার সময় ধরা পড়ার পর সঙ্গে সঙ্গে সেটা জেলা রেজিস্ট্রার মুকলেছুর রহমানকে জানানো হয়েছে।’

এতবড় গুরুতর অপরাধ করার পরও তাকে কেন পুলিশে দেওয়া হলো না বা বরখাস্ত করা হলো না- এমন প্রশ্নে সাব-রেজিস্ট্রার মাহবুবুর রহমানের উত্তর, ‘জেলা রেজিস্ট্রার ব্যবস্থা না নিলে আমার কিছু করার থাকে না। তবে দেখা যাক শেষমেশ কী হয়।’

নকলনবিশ নেতা আবদুল কুদ্দুছ ক্ষোভের সঙ্গে জানান, বর্তমানে ঢাকার রেকর্ডরুমে বালামের পাতা ছেঁড়ার হিড়িক পড়েছে। প্রায় ২০ লাখ বালাম বই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। শুধু আবিদই নয়, ইতিপূর্বে অনেক উমেদার ও দলিল তল্লাশিকারক বালাম বই ছেঁড়ার সময় হাতেনাতে ধরা পড়লেও কোনো বিচার হয়নি। উল্টো তারা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রেকর্ডরুমে কী পরিমাণ বালামের পাতা ছেঁড়া হয়েছে সেটা আল্লাহ মালুম! এর আগে ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে নকলনবিশ আসমা বালাম বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ভ্যানিটি ব্যাগে নিতে গিয়ে ধরা পড়েন। কিন্তু তাকে শুধু একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দেও আসমা একই অপকর্ম করে সহকর্মীদের হাতে ধরা পড়েন। কিন্তু কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। নামমাত্র তদন্ত কমিটি করা হলেও মোটা অংকের ঘুষের কাছে তা অন্ধকারে তলিয়ে যায়। আসমা বর্তমানে মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কাজ করছেন। পুনরায় ঢাকা রেকর্ডরুমে বদলি হওয়ার জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

বালামের পাতা ছেঁড়ার বিষয়টি জানার জন্য ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গিয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মুখলেছুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। তার প্রধান সহকারী মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি জানান, বালামের পাতা ছেঁড়ার বিষয়ে উমেদার আবিদের বিরুদ্ধে লিখিত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মুখে মুখে ঘটনাটি জানা গেছে। কিন্তু এতবড় একটি অপরাধের বিচার তো আর মুখে মুখে শোনা কথায় হয় না। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের লিখিত অভিযোগ থাকা জরুরি।

রেকর্ডরুমের ৪ তলায় বসে পাতা ছেঁড়ার অপকর্ম করে থাকে আবিদ। সেখানে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ পাতা ছেঁড়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার কারণে তিনি সাময়িক গা ঢাকা দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করার পরই তিনি প্রকাশ্যে আসবেন বলে জানা গেছে। বিগত দিনে একই কৌশল অবলম্বন করে তিনি বালাম বইয়ের পাতা ছেঁড়ার মতো গুরুতর অপরাধ থেকে পার পেয়েছেন।

দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত উমেদার এলাহি খোরশেদ আবিদের বাড়ি ঢাকা জেলার দোহার নবাবগঞ্জে। একসময় নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ছিলেন তার এলাকার আবদুল মান্নান। তার মাধ্যমে ‘পাতলা কাগজ’-এর বদৌলতে দৈনিক ৬০ টাকা মজুরিতে রেকর্ডরুমে উমেদারের চাকরি নেন। নিয়োগবিধি বহির্ভূত সম্পূর্ণ নিজস্ব ক্ষমতায় মাথাপিছু তিন/চার লাখ টাকার বিনিময়ে আবদুল মান্নান অনেককে এমন ‘পাতলা কাগজ’ দিয়েছেন বলে জানা যায়। যার বদৌলতে তারা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও রেকর্ডরুমে ঘুষ-দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছেন। যার কারণে অনেকে এদেরকে উপহাসছলে ‘মান্নান ক্যাডার’ বলে থাকেন।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.