কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দাম বেড়েছে অধিকাংশ পণ্যের। বিশেষ করে শাকসবজির মূল্য চড়া। বেশিরভাগ কাঁচাপণ্য বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি মূল্যে। এতে সদাইয়ের পরিমাণে কাটছাঁট করছেন ক্রেতা, আর গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা বাড়ছে বিক্রেতার। স্বস্তিতে নেই কেউই। আয় না বাড়লেও খরচের চাপ বাড়ায় অনেক পরিবার এখন আগের মতো বাজার করতে পারছে না।
প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা ছোট হচ্ছে, কমছে কেনাকাটা। নির্দিষ্ট আয়ে চলা পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। আয় না বাড়লেও বাজারের লাগামছাড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন আরো কঠিন হয়ে উঠছে। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সব পণ্যে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ চাপ আরো বাড়তে পারে। মানুষের এই চিত্র দেখা গেল রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকানগুলোয়। আর মোহাম্মদপুরের খুচরা বাজারের দৃশ্য আরো করুণ। সবজি, মাছ, মুরগি— প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই চড়া। একটু ছাড় পাওয়ার আশায় এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছেন ক্রেতা। অবশেষে চাহিদার তুলনায় কম সদাই নিয়েই ফিরতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে স্বস্তিতে নেই বিক্রেতারাও। তারা বলছেন, গত কয়েকদিনের বৃষ্টি ও তেলের দামের সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন খরচ। কমেছে বিক্রি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন রফিকুল ইসলাম। মাসে আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। গতকাল মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারে বাজার করতে আসেন তিনি।
রফিকুল বলেন, আগে একবার বাজারে গেলে সপ্তাহের সবকিছু নিয়ে আসতে পারতাম। এখন একই টাকায় অর্ধেকও হয় না। তাই বাধ্য হয়ে অনেক কিছু বাদ দিচ্ছি। গৃহিণী ফাতেমাও একই ভাষায় কথা বলেন। তাঁর স্বামী ছোট ব্যবসা করেন। মাসে আয় করেন সর্বসাকুল্যে ৩০-৩৫ হাজার টাকা। সংসারে দুই সন্তান। বড় সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করছেন গত বছর।
তিনি বলেন, বাচ্চাদের জন্য আগে নিয়মিত দুধ-ডিম রাখতাম। এখন দাম এত বেশি যে সবসময় কেনা যায় না। হিসাব করে চলতে হচ্ছে। ইচ্ছে করলেও সব জিনিস কিনতে পারি না।
মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাল, ডাল, তেল, ডিম, মুরগি-প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই চড়া। মাঝারি মানের চাল কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬২ টাকা, মোটা চাল ৫৮-৬০ টাকা। মিনিকেট চাল ৮০-৯০ টাকায়। চিকন মসুর ডাল কেজিতে ১৪০-১৫০ টাকা ও মোটা মসুর ডাল ১০০-১১০ টাকা। ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৪০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৮০-১৯০ আর সোনালি মুরগি ৩৬০- ৩৮০ টাকা। সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। বেশিরভাগ সবজি ৬০-৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি। পটোল, ঢ্যাঁড়শ ৬০-৮০ টাকা আর ঝিঙ্গা, করলা, বরবটি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁকরোল বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকায়। কাঁচামরিচ ৮০-১০০, ট্যামাটো ৫০, পেঁপে ৭০-৮০, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৫০ ও বেগুন ৭০-৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আলু ২০-২৫, পিঁয়াজ ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি সাইজের লাউ পিস প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়।
কারওয়ান বাজারে ছোট্ট দোকান সাজিয়ে বসেছেন সবজি বিক্রেতা মো. সোহেল। ভোরে আড়ত থেকে নেন পণ্য। সকাল থেকে শুরু হয় বিক্রি। তবে আগের মতো ব্যবসা নেই বলে মন খারাপ এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর। সোহেলের ধারণা, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় নষ্ট হয়েছে ফসল। আবার জ্বালানির উচ্চমূল্য ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আসতে পারছে না ঢাকায়। সরবরাহ কম হওয়ায় চড়ছে দাম। বিক্রি কমে যাওয়ার তথ্য দিলেন অন্য বিক্রেতা আনিস। বললেন, আগে একজন ক্রেতা একসঙ্গে নিতেন দু-তিন কেজি সবজি। এখন আধা কেজি বা এক কেজির বেশি নিতে চান না অনেকেই। অধিকাংশই চলে যান দাম শুনে। এতে কমছে বিক্রি ও মুনাফা— উভয়ই।
বৃষ্টির কারণে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা দাম বাড়ার কথা জানালেন বিক্রেতারা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে শসার। কেজিতে ৩০ টাকা থেকে বেড়ে গতকাল হাইব্রিড শসা বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়।
এ ছাড়া বেগুন, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, টমেটোর দামও কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। পেঁপে ও কাঁচা মরিচের মূল্যও ২০ টাকা বেড়ে যথাক্রমে বিক্রি হচ্ছে ৪০ এবং ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। গতকাল সোমবার সকালে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করতেই বেরিয়ে এলো হতাশার সুর। তারা জানালেন, মানভেদে লম্বা বেগুন কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, আর বড় গোল বেগুনের দাম উঠছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। কাঁকরোলও বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে।
এ ছাড়া টমেটো ৬০-৭০ টাকা, বরবটি ও ঝিঙে ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং পটোল ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। কাঁচামরিচের কেজি ১২০ টাকা। করলা ও লাউয়ের দামও যাচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। কিছুটা স্বস্তি আছে আলু ও পেঁয়াজের বাজারে। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়।
একের পর এক দোকানে বেগুনের দাম জিজ্ঞেস করতে দেখা গেল হার্ডওয়্যার দোকানের তরুণ শ্রমিক তুষারকে। তাকে একই সুরে জবাব দিয়ে হতাশ করছেন দোকানিরা, জানাচ্ছেন— বেগুনের কেজি ১০০ টাকা, কোনো কম হবে না। তবে ৮০ টাকায় কেনার আশায় দোকানের পর দোকান মাড়িয়ে চললেন তুষার। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে এক কেজির পরিবর্তে কিনলেন ৫০০ গ্রাম। একই বাজারে দেখা হয় আফরোজা বেগমের সঙ্গে। মাছ কেনার জন্য দরদাম করছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, সন্তানরা মাছ খেতে চায়, কিন্তু এখন বাজারে গেলে লাগে ভয়। এক কেজি পাঙাশও ২০০ থেকে ২২০ টাকা। অন্য মাছের কথা না হয় বাদই দিলাম। আগে মাসে অন্তত দু-তিনবার কিনতে পারতেন মুরগি। এখন সেটি কমাতে বাধ্য হয়েছেন— যোগ করলেন তিনি। দাম শুনে খরচে কাটছাঁট করার কথা জানালেন ক্রেতা আবদুল মালেক। বাজারে এসে এখন হিসাব করে চলতে হয়। চড়া মূল্যের কারণে প্রয়োজন হলেও কেনা যাচ্ছে না। তাই চাহিদার তুলনায় কম পণ্য নিয়েই ফিরতে হচ্ছে বাড়ি— আক্ষেপ করলেন তিনি।
মাছের বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি। চাষের পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ এবং রুই ৪০০-৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মাছের দাম আরও বেশি; মিলছে না ৭০০ টাকার নিচে। ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে। অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮৫-১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি কাটছে ৩৩০-৩৫০ টাকায়। একই সঙ্গে ডিমের বাজারেও মিশ্র চিত্র। এক ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তির সম্ভাবনা কম— আশঙ্কা বিক্রেতাদের।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এপ্রিল মাসের অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় দেশের মূল্যস্ফীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









