ডিমের বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মুরগির ডিমের দাম প্রতি ডজনে প্রায় ৪০ টাকা বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত ডিম কিনতে গিয়েও চিন্তার ভাঁজ পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের কপালে। অভিযোগ উঠেছে, দাম নিয়ে এমন অস্থিরতার পিছনে কলকাঠি নাড়ছে বড় আড়তদাররা। পাশাপাশি তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির নির্ধারণ দামেই সারাদেশে ডিম বেচাকেনা হয় বলে জানিয়েছেন প্রান্তিক খামারিরা।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তে তথা পাইকারি বাজারে ডিমের দাম বেড়েছে। এ কারণে তাদের বাড়াতে হয়েছে। তবে আড়তদার বা পাইকারি ব্যবসায়ী ও খামারি একে অন্যকে দুষছেন। প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, তারা ডিম উৎপাদন করলেও বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ঢাকার আড়তদাররা বিশেষ করে তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির বেঁধে দেওয়া দামে সারাদেশে ডিম বেচাকেনা হয়। বাজারের চাবিকাঠি তাদের হাতেই। তবে এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ঢাকার তেজগাঁওয়ের ডিম ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, দেশের আনাচে-কানাচে ডিম উৎপাদন হয়। দৈনিক লাখ লাখ ডিম উৎপাদন ও বেচাকেনা হয়। সে তুলনায় তেজগাঁওয়ে যে ডিম বিক্রি হয়, তা খুবই সামান্য।
ক্রেতারা জানান, ২০-২৫ দিন আগেও প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ৯৫ থেকে ১১০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। তবে গত সপ্তাহ থেকে দাম আরো বেড়ে বর্তমানে প্রতি ডজন ডিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিনিয়তই বাজারে মাছ, মাংস, শাক-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়ছে। তবে আয় বৃদ্ধি না হওয়ায় জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বলেও দাবি করেন সাধারণ ক্রেতারা।
সরেজমিনও মিলেছে দাম বৃদ্ধির সত্যতা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার, বনানী কাঁচাবাজারসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফার্মের মুরগির বাদামি রঙের প্রতি ডজন ডিম ১৪০ ও সাদা রঙের ডিম ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বিভিন্ন গলি বা ছোট বাজার ও দোকানগুলোতে প্রতি ডজন ডিম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা দাম নেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, পাইকারি বাজারে বেশি দামে তাদের ডিম কিনতে হয়। ফলে বাধ্য হয়েই খুচরা পর্যায়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি স্বীকার করে ডিম ব্যবসায়ীরা বলেন, বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ডিম সরবরাহ হচ্ছে না। ডিম কম আসায় পাইকারি বাজারে দর কিছুটা বেড়েছে। তাদের দাবি, মাসখানেক আগে মুরগির দাম বেশি ছিল। দাম পাওয়ার আশায় অনেক খামারি ডিমপাড়া মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে বর্তমানে ডিমের কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনে দাম বাড়ার চিত্র দেখা গেছে। সংস্থাটি বলছে, গত এক মাসে ২২ শতাংশ ও এক বছরের ব্যবধানে ৮ শতাংশ দাম বেড়েছে ডিমের। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নিত্যপণ্যের বাজারে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। এবার সেই তালিকায় উঠে এসেছে ডিম। খাদ্য মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক চাপে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসছে। মাছ-মাংসের উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ডিমের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। এখন ডিমের দামও বাড়ায় পুষ্টি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
তবে বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, মাসখানেক আগে যখন ডিমের দাম কম ছিল, তখন মজুতদাররা হিমাগারে বিপুল পরিমাণ ডিম মজুত করে। যখন দাম বাড়ে তখন তারা বাজারে বেশি দামে মজুত ডিম ছাড়ে। পাশাপাশি তারা প্রান্তিক খামারিদের ডিম সংগ্রহ কমিয়ে দেয়। এতে প্রান্তিক খামারিরা কম দামে দিতে বাধ্য হন। তবে মজুতদার বা বড় ব্যবসায়ীরা বিপুল মুনাফা লুটে নেয়।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, বার বার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দিয়ে অনেক আগে থেকে বলা হচ্ছে– প্রান্তিক খামারিরা ডিম উৎপাদন করে, কিন্তু দাম নির্ধারণ করে ডিম ব্যবসায়ী সমিতিগুলো। বিশেষ করে, মূল ভূমিকায় থাকে তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি। তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দাম বাড়ায় বা কমায়।
তিনি বলেন, মাসখানেক আগে যখন ডিমের দাম কম ছিল, তখন মজুতদাররা হিমাগারে ডিম মজুত করেছিল। কীভাবে ডিম মজুত করা যায় তার ব্যাখ্যাও দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, হিমাগারে চার-পাঁচ মাস ডিম সংরক্ষণ করা যায়। যেমন, এক সপ্তাহ ধরে একটি হিমাগারে একসঙ্গে তিন লাখ পিস ডিম রাখা হলো। ১৫ দিন পর এক লাখ পিস বের করা হলো। আবার দুই লাখ পিস ঢুকানো হলো। এভাবে মজুত করা হয়। যখন দাম বাড়ে তখন তারা বাজারে বেশি দামে মজুত ডিম ছাড়ে। কিন্তু প্রান্তিক খমারিদের ডিম সংগ্রহ কমিয়ে দেয়। ফলে প্রান্তিক খামারিরা কম দামে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু মজুতদার বা বড় ব্যবসায়ীরা মুনাফা লুফে নেন। দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত হিমাগারে ডিম সংরক্ষণ করা যায় বলে জানান এই খামারি।
ভোক্তাসংশ্লিষ্টরা বলেন, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে ডিম ছিল তুলনামূলক সাশ্রয়ী খাদ্য। এখন ডিমের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয় আরও চাপে পড়েছে। উৎপাদন পর্যায়ে ডিমের দাম যতটা বাড়ছে, ভোক্তা পর্যায়ে তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেটের অভিযোগও নতুন নয়।
সার্বিক পরিস্থিতিতে দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার, মজুত ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব এবং উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে ডিমের বাজার বারবার অস্থির হয়ে উঠছে। দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার, মজুত ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
তাঁর মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে দাম কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল বাজার নিশ্চিত করতে হলে পোলট্রি খাতের উৎপাদন ব্যয় কমানো, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের বিকল্প খোঁজা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









