দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট দূর করতে সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প অনুমোদন করা হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
পদ্মা ব্যারেজসহ মোট নয়টি প্রস্তাব এদিন একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প দুটি; সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি। এছাড়া একটি প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে। নয়টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকার অর্থায়ন করবে সরকার। আর ২০৪ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকার অর্থায়ন করা হবে সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধন)” প্রকল্পের ব্যয় ২৯০ কোটি ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৬২০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা থেকে ৫৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘জেলা শহরে বিদ্যমান মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে উন্নীতকরণ/পুনর্নির্মাণ (প্রথম ফেইজ)’ প্রকল্পের জন্য ১৩২৯ কোটি ৫৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘হাই-টেক সিটি-২ এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ (তৃতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৪৩৩ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমনি নিবাস নির্মাণ/পুনঃনির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৫৯৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা থেকে ২০৮ কোটি ২৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে ৪ এসএম ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৮৫ কোটি ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে একনেক।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড (পতেঙ্গা হতে সাগরিকা) (পঞ্চম সংশোধনী)’ প্রকল্পের ব্যয় ৩৩২৪ কোটি ১৫ লাখ ৩ হাজার টাকা থেকে ৭৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া হতে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প (প্রথম সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৭৫৭ কোটি ৯৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা থেকে ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর তৃতীয় একনেক বৈঠকে এসে প্রথম মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হল। ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেব বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার এ প্রকল্পের পুরো অর্থায়ন হবে সরকারের টাকায়। পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি গত ৬ মে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভ্যবতা জরিপের কাজ শেষ হয়ে আসার তথ্য দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে যে পানির অভাব দেখা দেয় এবং এর ফলে যে মরুকরণ ও লবণাক্ততার সৃষ্টি হয়, তা রোধ করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে পদ্মা নদীর ওপর একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা থেকে খাল বা ক্যানেলের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করা যাবে। একই সঙ্গে নদীর নাব্য রক্ষা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং মৎস্যসম্পদ উন্নয়নেও এ প্রকল্প ভূমিকা রাখবে। খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা এ প্রকল্পের আওতায় আসবে। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থাপনাকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা হয়েছে প্রকল্প নথিতে। পাশাপাশি সুন্দরবনে স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় পানি নিষ্কাশনের উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এ প্রকল্পের মূল অংশ হল পদ্মা ব্যারেজ, যা ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে।
সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো হিসেবে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস, দুটি ফিশ পাস ও নেভিগেশন লক। এ ছাড়া গড়াই অফ-টেক, চন্দনা অফ-টেক ও হিসনা অফ-টেক অবকাঠামো নির্মাণের কথা রয়েছে প্রকল্পে। একই সঙ্গে ১১৩ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে মূল ব্যারাজ থেকে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং গড়াই অফ-টেক থেকে ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং হিসনা নদী ব্যবস্থাপনায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ করা হবে। এ ছাড়া ১৮০ কিলোমিটার এফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। এর আগে প্রকল্পটি কয়েক দফা একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলেও তখন অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
পদ্মা ব্যারাজ কী?
ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিতব্য ব্যারাজে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে। প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানি নির্গমন পথ, ১৮টি নিম্নস্রোত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, মাছ চলাচলের বিশেষ পথ, নৌযান চলাচলের লক এবং নদীতীর রক্ষাবাঁধ। গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য তিনটি পানি গ্রহণ কাঠামো নির্মাণ করা হবে।
নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। এছাড়া ব্যারাজের মাধ্যমে ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধার তৈরি হবে। শুধু বাঁধ নয়, এ প্রকল্পে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এছাড়া ব্যারাজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এটিকে বহুমুখী করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে।
কোথায় হবে এ কর্মযজ্ঞ
এ প্রকল্পের মূল বাঁধ বা ব্যারাজ নিমার্ণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশায়। তবে প্রকল্পটিতে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা ও বরিশাল জেলার বিস্তৃত অঞ্চল যুক্ত করা হবে। এসব অঞ্চলে ধাপে ধাপে আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পদ্মা ব্যারাজের মোট প্রকল্প এলাকা বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলায় বিস্তৃত। তবে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দেশের চার বিভাগের ১৯ জেলার ১২০ উপজেলা উপকৃত হবে। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
কী আছে প্রকল্পে
পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি পাঁচটি নদীর সিস্টেম পুনরুজ্জীবিত করা হবে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলা) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ হ্রাস; স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ করা হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকার জলাবদ্ধতা হ্রাস ও পদ্মানির্ভর এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। পদ্মানির্ভর এলাকার প্রধান পাঁচ নদী-সিস্টেম পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি নদী পুনর্খনন ড্রেজিং ও রেগুলেটর দেওয়া হবে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মৃতপ্রায় হিসনা নদী পুনরুদ্ধার করে ‘হিসনা অফটেক’ নির্মাণ করা হবে।
এটা ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে। রাজবাড়ীর পাংশায় চন্দনা অফটেক হবে। এটা ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ৬৭ কিলোমিটার দূরে। কুষ্টিয়ায় গড়াই অফটেক নির্মাণ হবে, ভারত সীমান্ত থেকে যেটি প্রায় ৫৭ কিলোমিটার দূরে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া এবং জি-কে সেচ প্রকল্পে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পদ্মার মতো বড় নদীর ক্ষেত্রে পরবর্তীতে হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল অবস্থার পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয় বিধায় প্রকল্প বাস্তবায়নকালে এর গতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে নদীগুলোর হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সমীক্ষা হালনাগাদ করার প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে ডিপিপিতে কিছু পরামর্শক সেবার সংস্থান রাখা হয়েছে।
কেন এত আলোচনা
১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী শুকিয়ে গেছে। ফারাক্কা ব্যারাজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রথম পর্যায়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। পদ্মা বাঁধ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা।
তবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ১৯৯৬ সালে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। তবে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগেই ১৯৬১ সালে গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানো হয়। এরপর ২০০২ সালে কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা। পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত থাকে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
সম্পূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও অর্থায়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে এটিকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মূল ব্যারাজ ও গুরুত্বপূর্ণ নদী সিস্টেমের কাজ সম্পন্ন হবে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যারাজের উজানে ক্ষয় এবং ভাটিতে পলি জমার মতো পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত নকশা ও নিয়মিত হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল সমীক্ষার প্রয়োজন হবে। তবু এটি বাস্তবায়িত হলে মৃতপ্রায় নদীগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত হবে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি মূলত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিগত সরকারগুলোর সময় বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা তৈরি হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়লে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও কিছু ক্ষেত্রে পুনরুদ্ধার সম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









