পটুয়াখালীর দশমিনায় তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর ভাঙন দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। উত্তাল ঢেউ আর তীব্র স্রোতের করাল গ্রাসে একের পর এক বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, সড়ক ও বেড়িবাঁধ। নদীর প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে যেন ভেঙে পড়ছে নদীপাড়ের মানুষের বহু বছরের লালিত স্বপ্ন, স্মৃতি আর বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু।
উপজেলার বাঁশবাড়িয়া, ঢনঢনিয়া, হাজীরহাট, আরজবেগী, চরবোরহান ও চরহাদীসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। যে উঠানে একসময় শিশুদের হাসি-আনন্দে মুখর ছিল, আজ সেখানে শুধু নদীর কালো পানি আর দীর্ঘশ্বাস। কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও নদীর তীব্র স্রোতে ভাঙনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক পরিবার রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষার জন্য। কেউ কেউ আগেভাগেই ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। জোয়ারের সময় নদীর গর্জন শুনলেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। যেন প্রতিটি রাত তাদের কাছে এক অনিশ্চিত মৃত্যুভয়ের নাম।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের হাজীরহাট ও আরজবেগী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। নদীতীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে এসব যোগাযোগ ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী স্থায়ী ব্লক নির্মাণ ও কার্যকর নদী রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে এলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী উদ্যোগ দেখা যায়নি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
চারদিকে নদী বেষ্টিত চরবোরহান ইউনিয়নের দুর্ভোগ যেন আরও করুণ। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুবিধা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলের মানুষ প্রতি বছর নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে আছেন। এবারের ভয়াবহ ভাঙন তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চরবোরহান ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সোহেল রানা হাওলাদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “এই নদীর পাড়েই আমার জন্ম, এই মাটিতেই বাবার কবর, আমাদের সব স্মৃতি। কিন্তু এখন সেই নদীই আমাদের সবকিছু গিলে খাইতেছে। চোখের সামনে একের পর এক জমি নদীতে ভাইঙ্গা যাইতেছে, কিছুই করতে পারতেছি না। যে জমিতে ধান ফলাইয়া সংসার চালাইতাম, আজ সেই জমির কোনো চিহ্নও নাই। সারারাত ঘুম হয় না,কখন যে ঘরটাও নদীতে তলাইয়া যায় সেই ভয়েই থাকি। ছোট ছোট সন্তানগুলারে লইয়া কোথায় যামু, সেই চিন্তায় বুকটা ফাইটা যায়।”
সদর ইউনিয়নের চরহাদী এলাকার জেলে মো. রুবেল মাঝি বলেন, “নদীর সাথে যুদ্ধ করতে করতেই জীবন শেষ হইয়া গেল। আগে নদী অনেক দূরে আছিল, এখন ঘরের দরজার সামনে আইসা দাঁড়াইছে। প্রতি জোয়ারে মনে হয় এই বুঝি সবকিছু শেষ হইয়া যাবে। মাছ ধরা কমে গেছে, কাজকাম নাই, সংসার চালানো দায় হইয়া গেছে। বউ-বাচ্চা লইয়া খুব কষ্টে দিন কাটাইতেছি। সরকার যদি দ্রুত নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা গরিব মানুষগুলা একদিন রাস্তায় আইসা দাঁড়ামু।”
নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, বছরের পর বছর নদীভাঙনের শিকার হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষা এলেই আতঙ্ক, কান্না আর অনিশ্চয়তা নিয়েই দিন কাটাতে হয় নদীপাড়ের হাজারো পরিবারকে।
উপজেলাবাসীর দাবি, দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জিও ব্যাগ ও ব্লক স্থাপন এবং কার্যকর নদী রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক। নইলে অচিরেই নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে আরও বহু গ্রাম, আর নিঃস্ব হয়ে পড়বে হাজারো পরিবার।
পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শনকালে বলেন, “গলাচিপা ও দশমিনায় নদীভাঙন একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। নদীর মাঝখানে চর জেগে ওঠায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করলে নদীর নাব্যতা ফিরবে এবং ভাঙন অনেকাংশে কমে আসবে। সরকার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









