দেশে ৯০ শতাংশ এলপিজি স্টেশন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান। অবৈধভাবে অটোগ্যাস স্টেশন থেকে সিলিন্ডার ফিলিং হচ্ছে, যা নতুন করে দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছেন তিনি।
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপি গ্যাস) ব্যবহারে নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরেন আরাফাত। গতকাল রবিবার ঢাকায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কার্যালয়ে এলপিজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, লোয়াব এবং মাসিক ম্যাগাজিন এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার যৌথভাবে এ অনুষ্টানের আয়োজন করে।
এলপিজি ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের বিক্রেতাদের জন্য নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ইয়াসির আরাফাত। বলছিলেন, ‘অনেক স্থানে অনুমোদনহীন স্টোরেজ রয়েছে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইক্যুইপমেন্টও অনেক জায়গায় থাকে না। অনেকে ব্যয় সংকোচনের জন্য ‘সেইফটি টুলসগুলো’ বসানো হয় না।’‘এলপিজি খাত বড় হচ্ছে, কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি সেভাবে শক্ত হচ্ছে না। যে কোনো দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি অনেক সময় রিপোর্ট প্রকাশ করে না। সেজন্য সচেতনতা বাড়ে না। পূর্ব সতর্কতা অনেক দুর্ঘটনা রোধ করতে পারে’—যোগ করেন এই বিশেষজ্ঞ।
তার ভাষ্য, কোনো ছিদ্র হলে তা দ্রুত চিহ্নিত করা বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তি সেখানে থাকে না। অথচ সড়কে এলপিজির যেসব রোড ট্যাঙ্কার চলে সেগুলো বিস্ফোরণ হলে একটি শহরের অর্ধেক জনগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে যাবে।
বেইলি রোডে বিস্ফোরণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অধ্যাপক ইয়াসির বলেছেন, ‘বিস্ফোরণের দুই মিনিটের মধ্যে আগুন নিচতলা থেকে উপরে চলে গেছে। ছয় মিনিটের মধ্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলে এসেছিল। ওই ভবনের নিচ তলায়, সিঁড়িতে সব জায়গায় গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। রাবারের হোস পাইপের মাধ্যমে সেখানে গ্যাস পরিবহন করতে গিয়ে লিকেজ হতে পারে।
দেশে কিছুদিন পর পর এলপি গ্যাস থেকে সৃষ্ট লিকেজের কারণে ভয়াবহ বিস্ফোরণে মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টিতে রয়েছে পারস্পরিক দোষারোপ। বাংলাদেশে এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা এখন এক দশমিক ৫ থেকে এক দশমিক ৮ মিলিয়ন টন।
লোয়াব সভাপতি আমিরুল হকের মতে, ‘এলপিজির নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারি না। বিইআরসি ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে সবাইকে কমপ্লায়েন্স অর্জন করতে হবে। আমরা আমাদের সমালোচনা করতে চাই। কিভাবে সেটা অর্জন করতে পারব সেই রাস্তাটা আপনারা বের করে দেন।’
প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কারণে দিনে দিনে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে উল্লেখ করে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলছিলেন, ‘এলপিজি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশিক্ষণ চালু করা, নীতিমালা তৈরি করার যে প্রস্তাব এসেছে সেগুলো এগিয়ে নিতে হবে। নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা জাতীয় পর্যায়ে প্রচারণা শুরু করা উচিত।’
এলপিজিতে প্রপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ করা হলেও বাজারে সেটা সব সময় পাওয়া যায় না। এতে গ্রাহক ঠকার পাশাপাশি নিরাপত্তারও ঘাটতি সৃষ্টি হয় বলে মনে করেন বিইআরসির সদস্য সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলছিলেন, ‘সেইফটি ইস্যুতে আমরা স্ট্রাগল করছি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে মানহীন যন্ত্রাংশ ব্যবহার, আরেকটা হচ্ছে ব্যবহারকারদের মধ্যে সঠিক জ্ঞানের অভাব। এলপি গ্যাস স্টেশনের নীতিমালা হওয়ার আগেই সরকার গ্যাস স্টেশনের অনুমোদন দিয়েছিল।’
বাসাবাড়িতে এলপি গ্যাসের বিস্ফোরণ বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবহারকারীদের অসচেতনাকে দায়ী করেছেন ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধি ইকবাল বাহার বুলবুল। ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাতের বেলায় রান্না করে চুলা সঠিকভাবে বন্ধ করে না। রাতে গ্যাস লিক হতে হতে জমে যায়। সকালে কেউ সুইচ চাপলেই বিস্ফোরণটা ঘটে'—বলছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার এর সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









