ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে মাছের পোনাবাহী ট্রাক আটকে ব্যবসায়ী ও চালককে জিম্মি, বেধড়ক মারধর এবং ১ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) শাখা ছাত্রদলের দুই শীর্ষ নেতাকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় সংসদ।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলমের সই করা এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়।
বহিষ্কৃত দুই নেতা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি মিয়া বাবুল এবং মো. মিঠু।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো। ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন। একই সাথে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সাথে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে ভোর ৪টার দিকে কুয়াকাটা থেকে ছেড়ে আসা রেণু পোনা বোঝাই একটি ট্রাক বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভোলারোড এলাকায় আটকে দেয় ছাত্রদলের একটি গ্রুপ। এরপর তারা ট্রাকের চালক ও মালিককে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানের একটি ভাড়া বাসায়। সেখানে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীরা বিকাশের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করলে পরদিন সকাল ৯টার দিকে মিয়া বাবুল ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হায়দার মুন্সিসহ চারজন গিয়ে স্থানীয় দোকান থেকে সেই টাকা ক্যাশ আউট করে আনেন।
স্থানীয় ফার্মেসি ও বিকাশ ব্যবসায়ী লোকমান বলেন, “বুধবার সকালে মিয়া বাবুল আমাকে ফোন করে বলেন, ‘মামা, আপনার নাম্বারে টাকা পাঠাইছি, বন্ধু অসুস্থ, জরুরি লাগবে।’ এরপর আমি তাকে ৪৪ হাজার ৯০০ টাকা ক্যাশ বুঝিয়ে দিই।”
ভুক্তভোগী চিংড়ি পোনার মালিক আফতাফ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের মারধর করে মিজানের ভাড়া বাসায় আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে ১ লাখ টাকা কেড়ে নেওয়া হয়। আমরা এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই। ওরা ছাত্রদল করুক, কিন্তু মহাসড়কে এমন ডাকাতি ও চাঁদাবাজি কেন করবে?”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে একচ্ছত্র চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের একটি প্রভাবশালী গ্রুপ। এই চক্রে সহ-সভাপতি মো. মিঠু, আকিব, যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহিম হোসেন স্বজন, ইমরান মাহমুদ, শাখাওয়াত এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হায়দার মুন্সি ও শাহরিয়ার সরাসরি জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সুনির্দিষ্ট চাঁদাবাজির প্রমাণ মেলায় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় তলব করেছে কেন্দ্রীয় সংসদ।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল মূলত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। ৫ আগস্টের পর খোলস বদলে তিনি ছাত্রদলে যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের শীর্ষ চাঁদাবাজ রাজিব মণ্ডলের সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সভাপতির বিশেষ তদবিরেই তিনি সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন।
এদিকে বহিষ্কারের পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন মিয়া বাবুল। তিনি দাবি করেন, “আমাকে এখানে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে ভাই। খায় সবাই মিলে, কিন্তু নাম হয় শুধু আমার। এই চাঁদাবাজির টাকার ভাগ দলের অন্য বড় নেতারা এবং এলাকার কিছু লোকও পেয়েছে। আমি খুব দ্রুত সাংবাদিকদের সামনে মূলহোতাদের নাম ও প্রমাণ হাজির করব।”
মহাসড়কে ছাত্রদল নেতাদের এই বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বরিশাল বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের শীর্ষ কিছু নেতার মহাসড়কে চাঁদাবাজির বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি এবং আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও এটি জানেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশের টহল দ্বিগুণ করা হয়েছে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, উপযুক্ত প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরতে পারলেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









