কোম্পানিগুলো দেশে এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলার পর বাজারে সংকট আরো তীব্র হয়েছে। সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা মানুষের প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে দাম বাড়িয়ে চলেছেন। বাজারে তদারকি না থাকায় তাঁরা ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে আদায় করছেন ২ হাজার ৬০০ টাকা। গ্যাসের পরিমাণভেদে অন্যান্য সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে সেই অনুপাতে।
অথচ ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বেঁধে দেওয়া দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। এলপি গ্যাস আমদানিকারক ও সিলিন্ডারজাতকারী কোম্পানি কৃত্রিম সংকটের জন্য ডিলার, পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতাদের দোষারোপ করছে। অন্যদিকে ডিলার, পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, অক্টোবরে দাম বাড়ার আশায় কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় এই সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি। গ্রাহকরা বলছেন, দুপক্ষের এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের মাঝে পড়ে হয়রানি আর বাড়তি খরচের ফাঁদে আটকে গেছেন তাঁরা।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মার্চের শেষ দিক থেকে দেশে এলপি গ্যাস নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়। বিইআরসি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করে দিলেও ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। যুদ্ধের কারণে কম আমদানি ও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দামই আদায় করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে দাম আবার লাগামছাড়া হওয়া শুরু হয় গত সেপ্টেম্বরে। ১ হাজার ৫৮৫ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ধাপে ধাপে বেড়ে গত সপ্তাহে ২ হাজার ২০০ টাকায় দাঁড়ায়। এ সপ্তাহে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকা। ৩৩ কেজি সিলিন্ডারের দাম নেওয়া হচ্ছে এলাকাভেদে ৫ হাজার ৬০০ এবং ৩৫ কেজির সিলিন্ডার বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৮০০ টাকায়। এত বাড়তি দামেও সিলিন্ডার পেতে ক্রেতাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশে বর্তমানে এলপি গ্যাসের গ্রাহক প্রায় এক কোটি। দেশে প্রতি মাসে চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। এর ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় রান্নার কাজে। সর্বোচ্চ চাহিদা ১২ কেজি সিলিন্ডারের।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। এলপি গ্যাস কোম্পানিগুলো গত সোমবার মন্ত্রণালয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠকে এলপি গ্যাসের মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে। মন্ত্রী বুধবার অনলাইন বৈঠকে দেশের সব জেলা প্রশাসককে এলপিজির সংকট এবং অতিরিক্ত দামের বিষয়টি খতিয়ে দেখে তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকেরা তথ্য পাঠানোর পর আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব এলাকায় সরবরাহ কম পাওয়া যাবে, সেখানে সরবরাহ বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ ঠিক থাকার দাবি করলেও বাজারের চিত্র ভিন্ন। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট ও অতিরিক্ত দামের তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রাহকেরা নিজেদের অসহায়ত্বের কথাও জানালেন। খিলগাঁও গোড়ানের হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হোসেন দোকানে কিছু এলপিজির সিলিন্ডারও বিক্রি করেন। তিনি বলেন, তাঁর দোকানে মাসে ১০-১৫টি সিলিন্ডার বিক্রি হলেও ১৫ দিন ধরে কোনো সিলিন্ডার পাননি। তাঁর বাসায়ও এলপি গ্যাস ব্যবহার করেন। গ্যাস শেষ হলেও সিলিন্ডার না আসায় বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন।
মনে হয়, অক্টোবরের দাম ঘোষণার আগে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না। গোড়ানের কয়েকজন হোটেল ব্যবসায়ী জানান, ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডার ২০ সেপ্টেম্বরও ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার কিনতে হলো ২ হাজার ৬০০ টাকায়। বনশ্রীর এক রেস্তোরাঁর কর্মী জানান, তাঁরা এলপি গ্যাস পেলেও দাম অনেক বেশি। গ্যাসের খরচ পোষাতে তাই প্রতি প্লেট ভাতের দাম ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক সপ্তাহ আগে ২০ টাকা করা হয়েছে।
সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে অনেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে অকটেনের পরিবর্তে অটোগ্যাস বা এলপি গ্যাস ব্যবহার করেন। তবে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অনেক ফিলিং স্টেশনে অটোগ্যাসের সংকট চলছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক চালক। বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল মাওলা এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে অন্তত ১ হাজার ১০০ অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে। বর্তমানে এসব স্টেশনে এলপিজির সরবরাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে। সংকট সমাধানে দ্রুত যেন নতুন দাম সমন্বয় করা হয়, সে জন্য তাঁরা বিইআরসির কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু দাম সমন্বয় হয়নি, সরবরাহও বাড়েনি।
সাধারণত প্রতি মাসের ২ তারিখে এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। তবে ২ অক্টোবর শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় ৪ তারিখ রোববার নতুন দাম ঘোষণা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশে কমবেশি ৩০টি এলপিজি অপারেটর থাকলেও আমদানির সঙ্গে যুক্ত হাতে গোনা ৬ থেকে ৭টি কোম্পানি। এলপিজি সংকট নিয়ে কথা বলতে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হককে গতকাল মোবাইলে ফোন করা হলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে অপারেটরদের উদ্দেশে লেখা লোয়াবের একটি চিঠি দিয়েছেন তিনি। ওই চিঠিতে অবৈধ মজুত করলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো এলপিজি অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করেন এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে মজুত করেন, তবে তা প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এমন অনিয়মে জড়িত যে কারও বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে সরকার। এলপিজি সংকটের বিষয়ে কথা বলতে বিইআরসির চেয়ারম্যানকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









