দুয়ারে দুর্গাপূজা। অথচ নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগরের শাঁখারী পল্লিতে এবার নেই পূজার আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য। প্রতিবছর এই সময়ে শাঁখা তৈরির মেশিনের শব্দে মুখর থাকে পুরো এলাকা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে শঙ্খ কাটার কাজ, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সাদা গুঁড়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে শাঁখা কিনে নিয়ে যান। এবার ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ও অর্ডার কমে যাওয়ায় সেই ব্যস্ততা অনেকটাই ম্লান। উৎপাদন চললেও বিক্রি নিয়ে উদ্বেগে আছেন পল্লির শতাধিক পরিবার।
জামনগরে প্রায় শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাঁখা তৈরির সঙ্গে জড়িত। সারা বছর এই শিল্পে কমবেশি বেচাকেনা হলেও দুর্গাপূজার সময়ই তৈরি হয় সবচেয়ে বড় বাজার। এ কারণে কয়েক মাস আগে থেকেই বাড়তি উৎপাদনের প্রস্তুতি নেন কারিগরেরা। ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা শঙ্খ কেটে, ঘষে, পালিশ ও নকশা করে তৈরি করা হয় নানা ধরনের শাঁখা। পরে এসব পণ্য পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
কারিগররা জানান, পূজার কয়েক মাস আগে থেকেই ব্যাপারীরা জামনগরে এসে বড় পরিমাণে শাঁখার অর্ডার দিতেন। সেই অনুযায়ী বাড়ানো হতো উৎপাদন। এবার অর্ডার কম থাকায় আগের মতো চাপ নেই। তৈরি পণ্য বিক্রি করতেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে বেশি সময়।
দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে শাঁখা তৈরির সঙ্গে যুক্ত তুলসী সেন জানান, স্বাভাবিক সময়ে তাঁর মাসিক ব্যবসা দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে থাকে। পূজার আগে তা বেড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত উঠত। এবার উৎসবের মৌসুমেও সেই বাড়তি বিক্রি দেখা যাচ্ছে না। তবে পূজা ঘনিয়ে এলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হবে বলে আশা তার।
শাঁখা কারিগর জগন্নাথ পাল জগা জানান, গোটা শঙ্খ প্রথমে ভাঙা হয়। এরপর কাটা, পিস করা, ঘষামাজা ও নকশার কাজ শেষে সেটি শাঁখায় রূপ নেয়। এর মধ্যে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচও। আগে ৪০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক মিললেও এখন ৮০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া কঠিন। চাহিদা কম থাকায় বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কারিগররা আরও জানান, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও বাজারের দুর্বল চাহিদার কারণে শাঁখার দাম সে অনুযায়ী বাড়ানো যাচ্ছে না। এতে কমেছে লাভের পরিমাণ। তারপরও পুরোনো পেশা ধরে রাখতে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
জামনগরের শাঁখার বাজার স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত। নাটোর ও রাজশাহীর পাশাপাশি ঢাকাসহ রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, বরিশাল, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামে যায় এখানকার শাঁখা। কেউ সরাসরি পল্লিতে এসে কিনে নেন, আবার কেউ মুঠোফোনে অর্ডার দিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসে পণ্য সংগ্রহ করেন। এবার দুই ক্ষেত্রেই অর্ডারের পরিমাণ কমেছে।
মন্দার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। শাঁখারী ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান কয়েক মাস আগে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। আগের মতো লাভ না থাকায় পেশাটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
ব্যবসায়ী মিন্টু কুমার সেন বলেন, জামনগরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তবে এবার বাইরের ব্যাপারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
জামনগরের শাঁখা শিল্পের শিকড় বহু পুরোনো। স্থানীয়দের মতে, কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে এই কাজ চলে আসছে। ঢাকায় শঙ্খশিল্পীদের বসতি গড়ে ওঠার পর বিভিন্ন সময়ে তাঁদের একটি অংশ দেশের নানা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। তাঁদের একটি বড় অংশ এসে স্থায়ী হন জামনগরে। সেই ধারাবাহিকতায় আজও টিকে রয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।
জামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী বলেন, শাঁখা শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি এলাকার ঐতিহ্য ও গর্ব। কারিগরদের বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুল ইসলাম বলেন, জামনগরের শাঁখা শিল্প এ অঞ্চলের গৌরব। এর সঙ্গে জড়িত কারিগরদের উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









