দীর্ঘ ৫ বছর পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা ছাত্রদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পরপরই সংগঠনটির ভেতরে নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতৃত্বে একটি নির্দিষ্ট জেলাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে কমিটির পদপ্রাপ্ত ও পদবঞ্চিত একাধিক নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে ইংরেজি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদ রুমি মিথুনকে এবং সদস্য সচিব করা হয়েছে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাফিজ আহমেদকে। কমিটি ঘোষণার পর থেকেই নেতৃত্বের আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সংগঠনটির দলীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ববর্তী কমিটির আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদের বাড়ি ঝিনাইদহে। বর্তমান আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুনও একই জেলার বাসিন্দা। নতুন কমিটির সদস্য সচিবও ঝিনাইদহের। এছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির হোসেন, আবু সাঈদ রনি, তাপস অধিকারী, রিফাত হোসেইন, নয়ন হোসেন এবং সদস্যদের মধ্যে—রিয়াজ উদ্দিন, মেহমুদ হাসান উৎস, মুহাম্মদ সজিব হোসাইন, মাহফুজা খাতুন, নকিবুল ইসলাম অংকন, এনামুল হক পুলক, রুবায়েত আহমেদ লিমন, আশিক ইকবাল, আলীনূর ও মো. সাইফুল্লাহসহ ১৮ জনই ঝিনাইদহের বলে জানা গেছে। ফলে টানা দুই কমিটিতে একই জেলার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় অন্যান্য জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
নবগঠিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘‘বাসা পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া বা ঝিনাইদহ না।’’
আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আল আমিন লেখেন, ‘‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি আমাদের মতো বাইরের মানুষের জন্য না। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শৈলকূপা উপজেলা কমিটিকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’’
কমিটির সদস্য রাকিব হোসেন স্বাক্ষরও এক পোস্টে লেখেন, ‘‘শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল শৈলকূপা উপজেলা কমিটি।’’
সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার পারভেজ তার ফেসবুক টাইমলাইনে লেখেন, ‘‘উপজেলা কমিটি—ভাগ্য নাকি লবিং? কুষ্টিয়া জেলা জাতীয়তাবাদী আদর্শের সৈনিকেরা একদিন বুঝবেন, ইনশাআল্লাহ। প্রকৃতির বিচার অবধারিত।’’
অন্যদিকে, পদ না পাওয়া নেতা এস এম আহসান হাবীব লিখেছেন যে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেও কোনো মূল্যায়ন পাননি। তিনি লেখেন, ‘‘জীবনের মূল্যবান অনেক কিছু ত্যাগ করেছি ইবি ছাত্রদলের জন্য। বর্তমান নেতৃত্বকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।’’
বর্তমান কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক হওয়া নুর উদ্দিনকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি দাবি করে ছাত্রদল কর্মী শাফায়াত ইবনে ইমাম লেখেন, “যারা নীরবে পথ তৈরি করে, তাদের পদচিহ্নই অনেক সময় ধুলোয় চাপা পড়ে যায়।”
সবচেয়ে আলোচিত প্রতিক্রিয়া আসে পদবঞ্চিত কর্মী হাফিজুর রহমানের পোস্টে। তিনি লেখেন, “আমরা সংগঠনের জন্য কাজ করেছি, কোনো বড় ভাই, এমপি বা মন্ত্রীর জন্য নয়। যদি করতাম, তাহলে হয়তো আমরাও কমিটিতে থাকতাম। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনীতি করা কতটা কঠিন, তা কেউ বুঝবে না। আমার দুঃখ-কষ্ট হয়তো দলও বুঝবে না, এমনকি তারেক রহমান, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকও বুঝবেন না।”
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক বলয়ের মধ্যে নেতৃত্ব সীমাবদ্ধ রাখায় দূর-দূরান্ত থেকে এসে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা ত্যাগী ও মেধাবী নেতাকর্মীরা হতাশ হয়েছেন।
তাদের দাবি, এতে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় আধিপত্য, টেন্ডার-রাজনীতি এবং ক্যাম্পাসে প্রভাব বজায় রাখার বিষয় বিবেচনায় রেখেই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১৬ জুন লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের সাহেদ আহমেদকে আহ্বায়ক এবং ইংরেজি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের মাসুদ রুমি মিথুনকে সদস্য সচিব করে ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। প্রায় পাঁচ বছর পর নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে নতুন কমিটিতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী, নির্যাতিত, শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও ছাত্রত্বধারী অনেক নেতাকর্মী মূল্যায়িত হননি বলে সংগঠনের একাংশের অভিযোগ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









