রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (রাকসু) হামলার অভিযোগ এনে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় বেধড়ক পিটিয়েছে রাকসু ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।
আজ সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে দফায় দফায় এই ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সময় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী তার নিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় প্রক্টর দফতরে হুমকির অভিযোগ দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গতকাল রাতে একটি সভায় বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে নিজ এলাকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের আনাস, একই বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিব, সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন সেখানে যায়। পরে তারা অভিযোগটি অস্বীকার করে প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য শুরু করেন।
এ বিষয়ে আজ দুপুরে আবারও একটি সভা ডাকেন প্রক্টর। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে আনাসকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে দাবি করেন রাকসু ভিপি/জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এজিএস এস এম সালমান সাব্বিরসহ রাকসুর নেতারা। পরে রাকসু নেতারা আনাসের মোবাইল ফোন চেক করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান-হিল গালিবসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আনাসের ছবি খুঁজে পান। পরে প্রক্টরের উপস্থিতিতে জিএস আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির আনাসকে মারধর করেন। পরে দুপুরেই প্রক্টর বিষয়টি সাময়িক সমাধান করে দেন এবং আনাসসহ বাকিরা প্রক্টর দপ্তর থেকে চলে আসেন।
এরপর বিকেল তিনটার দিকে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন এই ঘটনার জেরে রাকসু ভবনে অতর্কিত হামলা চালানোর অভিযোগ করেন রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ অনান্য রাকসু নেতৃবৃন্দ। পরে রাকসু নেতারা তাদের ওপর পাল্টা চড়াও হলে সেখান থেকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠ কক্ষের সামনে আসেন। তখন রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বিএম নাজমুস সাকিবের হাতে আঘাত দেখতে পাওয়া যায়। তার ওপর আনাসসহ সহযোগীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এরপরে সেখানে রাকসু জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, আহত বিএম নাজমুস সাকিব, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, শাখা শিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান, প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, দপ্তর সম্পাদক মানাজির আহসান, অর্থ সম্পাদক শামীম পাটোয়ারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও শাখা শিবিরের ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ ফাহিম রেজা, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম, শহীদ হাবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহসানউল্লাহ ফারহান, জিএস আশিক শিকদার, নবাব আব্দুল লতিফ হল জিএস নূরুল ইসলাম শহীদ, 'শিবির ক্যাডার' ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্বিবেচনায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী রমজান আলীসহ অন্যান্যরা উপস্থিত হন।
এ সময় রাকসু জিএস আম্মার বেলচা হাতে দূর থেকে ঐ শিক্ষার্থী ও তার সহযোগীকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। গ্রন্থাগারের সামনে থেকে ওই শিক্ষার্থীরাও গালির প্রতিউত্তর দেন। এ সময় প্রক্টর মাহবুবর রহমান তাদেরকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পাঠ কক্ষের ভেতরে নিয়ে যান। পরে শিবির ও রাকসু নেতারা অতর্কিতভাবে পাঠ কক্ষের ফটক থেকে প্রক্টরকে ধাক্কা দিয়ে পাঠ কক্ষে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তারা ওই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তুমুল মারধর শুরু করেন। এ সময় তারা হাতের কাছে পাওয়া কাঠ, বাঁশ, রড, বেল্টসহ লাঠিসোটা দিয়ে তাদেরকে পেটান রাকসু ও শিবির নেতারা। পরে তাদের হামলা ঠেকাতে পাঠাগারের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসলে তাদেরও মারধর করেন উত্তেজিত শিবির ও রাকসু নেতারা। পরে ওই শিক্ষার্থীদের আহত অবস্থায় রেখে শিবির ও রাকসু নেতাদের পাঠ কক্ষ থেকে বের করে দেন প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ সদস্য ও পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা।
এর কিছু সময় পরে গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে ভেতরের একটি গেট দিয়ে নিয়ে মূল ফটক দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিনসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। পরে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় ফাহিম রেজা 'আমার ভাইদের মারলি কেন?' এ কথা বলেই আরও এক দফা হামলা করেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে তাকে নামিয়ে আবারও বেধড়ক লাথি মারেন এবং টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সহায়তায় হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এর পরে রাকসু ও শিবির নেতারা এক হয়ে 'নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার', 'হাতে তালি, শিবির', 'মুখে বলি, শিবির', 'ছাত্রলীগের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না'। পরে বিকেল সাড়ে চারটা থেকে বিকেল পৌনে ৬টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচার দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে অবস্থান করছে শিবিরের নেতাকর্মীরা।
হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে পাঠ কক্ষে অধ্যয়নরত পদার্থ বিজ্ঞানের ১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দিন বলেন, "আমরা এখানে পড়ছিলাম। তারপর তারা অতর্কিত সবাই রিডিং রুমে ঢুকে পড়ে। তারা যাকে পাচ্ছে তাকেই ছাত্রলীগ ট্যাগ দিচ্ছে। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দিকেও তারা উগ্র হয়ে হামলা করে। ছাত্রলীগ হলেও তাকে মেরে ফেলার অধিকার তো কারও নাই। বিচারের জন্য দেশে আইন আছে।"
হামলার আনাস বলেন, "আজকে আমাদের প্রক্টর অফিসে ডাকলে সেখানে আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেয়। সালাউদ্দিন আম্মার লোকজন নিয়ে এসে আমাকে মারা শুরু করে। তারপর আমাদের প্রক্টর অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর আমরা সেখান থেকে লাইব্রেরিতে চলে আসি। এরপর অন্য কেউ হয়তো রাকসুর সামনে তাদের সাথে হাতাহাতি করে। তারপর আম্মার লোকজন নিয়ে এসে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে আমাকে মারধর করে। আমার উপর কমপক্ষে ২০০টিরও বেশি আঘাত করা হয়েছে।"
তিনি ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী নন এ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, "অতীতে আমার বন্ধুরা হয়তো ছাত্রলীগ করতো তাই হয়তো কোনো এক জায়গায় তাদের সাথে আমার ছবি রয়েছে। তবে ছাত্রলীগের ব্যানার-ফেস্টুনে আমার কোনো ছবি নেই।"
হামলার বিষয়ে শিবিরের দায় অস্বীকার করে শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, "এখানে শিবিরের কেউ ছিল না। আমরা আমাদের ভাই রাকসু নেতাদের হামলার কথা শুনে দ্রুত এখানে আসি। এখানে এসে এই পরিস্থিতি দেখতে পাই।" হামলার ঘটনায় শিবিরকে দেখা গেছে এবং এর ভিডিও ফুটেজ আছে, এটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
জানতে চাইলে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, "আমাদের রাকসু ভবনে গিয়ে মারধর করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। প্রশাসনকে আমরা ছাত্রলীগের ওই নেতাকে পুলিশে দেওয়ার আহ্বান জানাই। তবে তারা তাকে কিছুই করেনি। আমাদের উপরে হামলার পরে বাধ্য হয়ে আমাদের এখানে আসতে হলো।"
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, "যে নারীকে নিয়ে ঝামেলার শুরু, আমরা জেনেছি তাকে শিবিরের এক নেতা পছন্দ করতেন। এই কারণে একটি নারী ঘটিত বিষয়কে গোপনে সমাধান না করে শিবিরের সন্ত্রাসী বাহিনী রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে। আমরা আমাদের পবিত্র জায়গা লাইব্রেরিতে শিবিরের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।"
তবে এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









