তখন তিনি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। বয়স খুব বেশি নয়। সেই বয়সেই হারান বাবাকে। এরপর সংসারের কঠিন বাস্তবতায় মা ও বোনকে ঘিরেই বেড়ে ওঠা। জীবনের শুরুর স্বপ্ন ছিল অন্যরকম—কখনো চিকিৎসক, কখনো প্রকৌশলী, আবার কখনো শিক্ষক হওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে টেনে নেয় আইন।
সেই আইন পড়েই এখন বিচারক হওয়ার পথে দেবব্রত ভট্টাচার্য্য। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) আইন বিভাগের ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী প্রথমবার বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ১৮তম বিজেএসের ফল প্রকাশ হয় ২৩ সেপ্টেম্বর। একই পরীক্ষায় গোবিপ্রবির আইন বিভাগের আরও চার শিক্ষার্থীও সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
দেবব্রতের কাছে এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের অপেক্ষা, পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই।
স্বপ্ন বদলেছে, লক্ষ্য বদলায়নি
ছোটবেলায় বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতেন দেবব্রত। চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার ইচ্ছা ছিল। মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি। তখন নতুন করে ভাবতে শুরু করেন ভবিষ্যৎ নিয়ে।
ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয় খুঁজতে গিয়ে আইন পড়াশোনা ও পেশা সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর আইনকে বেছে নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় বর্ষে সিনিয়রদের কাছ থেকে বিচার বিভাগ সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়। তখনই মনে জায়গা করে নেয় নতুন একটি স্বপ্ন—একদিন বিচারক হবেন।
সেই স্বপ্নকে সামনে রেখেই ধীরে ধীরে শুরু হয় প্রস্তুতি।
পড়াশোনাকে আলাদা করেননি
দেবব্রতের প্রস্তুতির বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—একাডেমিক পড়াশোনা আর বিজেএসের প্রস্তুতিকে তিনি আলাদা করে দেখেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয় পড়ানো হয়েছে, সেটিই ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। নিজের নোট তৈরি করেছেন। কোনো বিষয় বাদ দেননি। দীর্ঘ সময় লাইব্রেরিতে বসে পড়েছেন। নিয়মিত রিভিশন দিয়েছেন।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের হিসাব না রাখলেও গড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা পড়ার চেষ্টা করতেন। তাঁর কাছে পড়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পড়া ধরে রাখা।
দেবব্রত বলেন, ‘একাডেমিক পড়াশোনাকে কখনো বিজেএসের প্রস্তুতি থেকে আলাদা করিনি। যে বিষয়গুলো পরে কাজে লাগবে, সেগুলো তখনই ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি। কোনো টপিক বাদ দিইনি।’
এলএল.এম শেষ হওয়ার আগেই বিজেএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। এরপর একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবারেই আসে সাফল্য।
পাশে ছিল কিছু মানুষ
দেবব্রতের গল্পে তাঁর মায়ের কথা আলাদা করে আসে। তৃতীয় শ্রেণিতে বাবাকে হারানোর পর সন্তানদের বড় করার দায়িত্ব অনেকটাই তাঁর মায়ের কাঁধে পড়ে। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত মায়ের ত্যাগকে নিজের জীবনের বড় শক্তি হিসেবে দেখেন দেবব্রত।
‘আমার সাফল্যের পেছনে মায়ের ত্যাগ অনেক বড়। শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং বন্ধুদের সহযোগিতাও পেয়েছি। তাঁদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ,’—বলেন তিনি।
বন্ধুদের সহযোগিতার কথাও বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা। প্রস্তুতির সময় মানসিকভাবে পাশে থাকা থেকে শুরু করে প্রয়োজনের মুহূর্তে ছোট-বড় নানা সহযোগিতা পেয়েছেন তাঁদের কাছ থেকে।
প্রথমবারের সাফল্য
প্রথমবার বিজেএস দিয়েই সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবরটি তাঁর কাছেও ছিল আনন্দের, আবার কিছুটা বিস্ময়ের।
তিনি বলেন, ‘আমি আগে থেকেই বিজেএসের জন্য পড়াশোনা করছিলাম। তবে এমন ফলাফল আসবে, সেটা আমার জন্য আনন্দের পাশাপাশি কিছুটা আশ্চর্যেরও ছিল। ঈশ্বরের কৃপা, সবার দোয়া ও শুভকামনা ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব ছিল না।’
তাঁর কাছে সাফল্যের সূত্র খুব জটিল নয়—নিয়মিত পড়াশোনা, নিজের ওপর বিশ্বাস এবং হাল না ছাড়া।
সামনে আরও বড় দায়িত্ব
একসময় যিনি বাবাকে হারিয়ে মায়ের হাত ধরে বড় হয়েছেন, সেই দেবব্রত এখন জীবনের নতুন অধ্যায়ের সামনে। সাফল্যের আনন্দের মধ্যেও তাঁর ভাবনায় দায়িত্বের জায়গাটিই বড়।
জুনিয়রদের জন্য তাঁর পরামর্শ, আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিজের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বিষয়গুলো বুঝে পড়তে হবে। আইনের পাশাপাশি সাধারণ বিষয়েও ভালো প্রস্তুতি নিতে হবে। নিজের নোট তৈরি করে নিয়মিত রিভিশন দিতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আত্মবিশ্বাস হারানো যাবে না।
দেবব্রতের গল্প তাই শুধু প্রথমবার বিজেএস পরীক্ষায় সাফল্যের গল্প নয়। এটি একটি স্বপ্ন বদলে যাওয়ার গল্প, হারানোর পরও এগিয়ে যাওয়ার গল্প। তৃতীয় শ্রেণিতে বাবাকে হারানো সেই শিশুটি আজ বিচারকের পথে। মাঝখানে ছিল দীর্ঘ এক পথ—মায়ের ত্যাগ, নিজের পরিশ্রম, কিছু মানুষের নিরন্তর উৎসাহ আর একটি স্বপ্নকে আঁকড়ে থাকার গল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









