রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার সাত দিন পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হামলায় জড়িতরা চিহ্নিত রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত কমিটিও কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। এরপরও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের তদন্তের গতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে হামলার শিকার সাংবাদিকদের দাবি, হামলাকারীরা অনলাইন ও অফলাইনে তাদের হুমকি দিচ্ছেন। এতে ক্যাম্পাসে তাদের নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। তবে পুলিশ বলছে, এখনও তদন্ত চলছে। দ্রুতই তদন্ত শেষে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দৈনিক সমকালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফ উজ জামান কোরবান এবং দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল আহত হন। এ ঘটনায় সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
ঘটনার পরেরদিন হামলাকারীরা চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হল প্রশাসন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করে। পাশাপাশি হামলাকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তাদের প্রতিবেদনে কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে হামলায় জড়িত হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের কাউকেই এখন পর্যন্ত পুলিশি মামলায় গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
হামলার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে জড়িত ছাত্রদল নেতারা হলেন—বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ও আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এম আহসান হাবীব; ছাত্রদল কর্মী ও অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের (ড্রপআউট) শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী (যিনি এর আগে শাখা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি আসাদুল্লাহ হিল গালিবের সঙ্গে রাজনীতি করতেন); যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের হাসিবুল ইসলাম; সহ-দপ্তর সম্পাদক ও সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শাহরিয়ার আলম অথী; সহ-সভাপতি ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শরিফুল ইসলাম; সহ-সভাপতি ও আইবিএ ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তাকবীর আহমেদ ইমন এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম, কর্মী ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের তানিম রহমান।
ঘটনার পর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকেরা ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের নাম উল্লেখ করে মামলা ও দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় আসামিদের নাম উল্লেখ না থাকায় সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
এদিকে হামলার ঘটনায় গঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) তাদের সুপারিশ উপাচার্যের কাছে উপস্থাপন করে। কমিটি শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এম আহসান হাবীব, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, কর্মী বিশাল চক্রবর্তী ও জিয়াউর রহমান হল জিএস আরিফুল ইসলামের ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিলের সুপারিশ করেছে। আরও চারজনের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত এবং তিনজনকে সতর্ক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে হামলার ঘটনায় শাখা ছাত্রদলের তিন নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক পদ ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার এবং আরও ছয়জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, হামলার ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ প্রশাসন ও পুলিশের কাছে রয়েছে। সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী হওয়ায় প্রশাসন তাদের গ্রেফতার করছে না। তাদের দাবি, হামলায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক এবং শিক্ষার্থীরা বৃহৎ আন্দোলনের দিকে যেতে বাধ্য হবে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (রাবিসাস) সভাপতি মীর কাদির বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা চিহ্নিত হলেও প্রশাসন তাদের গ্রেফতার করছে না। সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী হওয়ায় প্রশাসন তাদের ধরছে না। প্রশাসন স্পষ্টভাবে সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিচ্ছে। যদি সন্ত্রাসীরা অতিদ্রুত গ্রেফতার না হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক এবং শিক্ষার্থীরা বৃহৎ আন্দোলনের দিকে যেতে বাধ্য হবে।’
হামলাকারীরা অনলাইনে ও অফলাইনে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে উল্লেখ করে রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নূর আহসান মৃদুল বলেন, ‘হামলাকারীরা অনলাইনে ও অফলাইনে বিভিন্নভাবে আমাদের হুমকি দিচ্ছে। মেরে ফেলা এবং বাইরে পেলে ভেঙেচুরে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা স্বাভাবিক। কিন্তু এ বিষয়ে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীরবতা আমাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমার ক্যাম্পাস জীবনের বাকি দেড় বছর হয়তো এই আতঙ্ক নিয়েই কাটাতে হবে। অন্য ভুক্তভোগীদের মনেও দীর্ঘদিন এই ভয় থেকে যাবে যে হামলাকারীরা যেকোনো সময় আবারও আক্রমণ করতে পারে। কারণ তারা ইতোমধ্যে আমাদের ওপর বর্বরভাবে হামলা চালিয়েছে।’
প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের জিসান বলেন, ‘সাংবাদিকের মারধরের ঘটনা সাত দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। এটা পুলিশের বড় একটা ব্যর্থতা। ঘটনার অভিযুক্তদের সকল ধরনের ডকুমেন্ট থাকার পরেও কেন যে তাদেরকে আটক করা হচ্ছে না এটা বড় প্রশ্ন। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









