মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। অথচ ওষুধের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সুস্থভাবে বেঁচে থাকাকেই কঠিন করে তুলছে। চাল, ডাল, তেল কিংবা গ্যাসের দাম বাড়লে জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়, প্রতিবাদ হয়। কিন্তু জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম বাড়লেও এ নিয়ে কার্যকর প্রতিবাদ ও দৃশ্যমান সরকারি উদ্যোগের অভাব লক্ষণীয়। প্রশ্ন হলো, অসুস্থ হলে ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
রাজধানীর কড়াইল বস্তির বৃদ্ধ আরফান মিয়ার অভিজ্ঞতা এ সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। আগে যে ওষুধ কিনতে মাসে এক হাজার টাকা লাগত, এখন তা কিনতে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ আয় না বাড়লেও চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। এ পরিস্থিতি শুধু নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যও উদ্বেগজনক। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে পুষ্টিকর খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য এ সংকট আরো ভয়াবহ। গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। এর বড় অংশ ব্যয় হয় ওষুধ কেনায়। ফলে, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি নিছক বাজারদরের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যে ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচানোর কথা, তার উচ্চমূল্য যেন মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
ওষুধের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচের মতো বাস্তব কারণ থাকতে পারে। ওষুধশিল্পের উৎপাদন সচল রাখা এবং মান বজায় রাখাও জরুরি। কিন্তু এসব অজুহাতে ইচ্ছামতো মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া যায় না। উৎপাদকদের যৌক্তিক ব্যয় বিবেচনার পাশাপাশি ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা ও জীবন রক্ষার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজন স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা, নিয়মিত ব্যয় পর্যালোচনা এবং কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দেশের লাইসেন্সধারী সব ফার্মেসির তথ্য অনলাইন ডেটাবেসে নেই। পাশাপাশি নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগও উদ্বেগ বাড়ায়। ফার্মেসির সংখ্যা বাড়লেও যথাযথ তদারকি নিশ্চিত না হলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে। নিয়মিত বাজার তদারকি, মূল্যতালিকা প্রদর্শন, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। এতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার বাড়ছে, ফলে, সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারকে অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। দরিদ্র ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য ভর্তুকি, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির ওপর কার্যকর নজরদারি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় ও মুনাফার হিসাব জনসমক্ষে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা থাকে।
ওষুধ কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপকরণ। তাই ওষুধের বাজারকে শুধু মুনাফার হিসাব দিয়ে পরিচালিত হতে দেওয়া যায় না। সরকার, ওষুধ উৎপাদক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ওষুধের দাম রাখা এবং মানসম্মত ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। কারণ, ওষুধ কিনতে না পেরে কোনো মানুষ যেন চিকিৎসাবঞ্চিত না হন- এ দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ কারও নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









