চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছর পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০১৯ সালে দুবাই সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এই চুক্তি হলো। চট্টগ্রাম বন্দরে চালু চারটি টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় এনসিটি। বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালে ওঠানো-নামানো হয়।
২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ টার্মিনালটিতে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়। নির্মাণের পর প্রথমে আংশিক ও পরে পুরোদমে চালু হয় টার্মিনালটি। দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এত দিন এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। বর্তমানে টার্মিনালটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়া নিয়ে অন্তবর্তী সরকারের আমল থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন করে আসছেন।
এনসিটিকে লাভজনক টার্মিনাল হিসেবে অভিহিত করে তাঁরা এই চুক্তির বিরোধিতা করছেন। যদিও সরকার থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নিলে শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। আগামী ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া হবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই পক্ষ সম্মত হলে আলোচনার ভিত্তিতে এই মেয়াদ বাড়ানো যাবে। তবে কোনো পক্ষ রাজি না হলে চুক্তি ১৫ বছরেই শেষ হবে। চুক্তির আওতায় টার্মিনালটি বুঝে নেওয়ার আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কিছু অত্যাবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করতে হবে।
টার্মিনাল পরিচালনায় স্থানীয়ভাবে একটি কোম্পানি গঠন করে কাগজপত্র বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি জমা দিতে হবে পরিবেশগত সমীক্ষা ও ছাড়পত্র। টার্মিনাল হস্তান্তরের আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ একজন স্বতন্ত্র প্রকৌশলী নিয়োগ দেবে। তিনি যন্ত্রপাতিসহ সম্পদের অবস্থা পর্যালোচনা করে বন্দরকে একটি প্রতিবেদন দেবেন। এসব প্রক্রিয়া শেষ করে টার্মিনাল বুঝে নেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এরপর টার্মিনালে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম ১০ বছরে টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি।
প্রথম ১০ বছরে টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড; আর বন্দর কর্তৃপক্ষ এককালীন অগ্রিম ফি হিসেবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পাবে। যার ২৫ শতাংশ অর্থ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ পরিচালনা শুরুর আগে পরিশোধ করার কথা। কনটেইনার পরিচালনা থেকে গড় আয়ের ভিত্তিতে রাজস্বের স্তরভেদে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত ভাগ পাবে চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে প্রতি একক কনটেইনারে ১৪০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার আয় হয় বন্দরের। এই আয়ের ৬৭ শতাংশ হিসাবে বন্দর পাবে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে ১০০ ডলার ৫০ সেন্ট। টার্মিনালটি পরিচালনা বাবদ বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। বছরে অন্তত ১২ লাখ ৩০ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাদের জন্য। গত অর্থবছরে এনসিটিতে একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার।
ফলে, কনটেইনার ওঠানো–নামানোর বাধ্যবাধকতার শর্ত পূরণে ডিপি ওয়ার্ল্ডের খুব বেশি অসুবিধা হবে না বলে মনে করছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সেবা কার্যক্রম শুরুর পর ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কনটেইনারের বিপরীতে মাশুল আদায় করবে। প্রতি কনটেইনারের মাশুল আদায় হবে সরকার নির্ধারিত হারে। এর বাইরে চুক্তিতে অনুমোদিত অতিরিক্তি বা বিশেষায়িত সেবার ক্ষেত্রে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রযোজ্য সার্ভিস চার্জ আদায় করতে পারবে। এসব অতিরিক্ত সেবা থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরকারও রাজস্ব হিসেবে পাবে।
আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা এই চুক্তিকে দেশবিরোধী বলে আখ্যায়িত করছেন, যা একটি রাজনৈতিক স্টান্টবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নির্দিষ্ট মেয়াদে টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। পুরো বন্দর ইজারা দেওয়া এবং একটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়। পতেঙ্গা টার্মিনাল সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। লালদিয়ায় এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। পিএসএ সিঙ্গাপুরের সঙ্গেও সমঝোতা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে আসাকে বড় অর্জন হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।
টার্মিনালটিতে কর্মরত বর্তমান কর্মীদের কী হবে? এমন প্রশ্ন উঠেছে । মূলত চুক্তির কারণে কোনো শ্রমিকের চাকরি হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা ও বর্তমান মোট বেতনের তথ্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে। তা বহাল থাকবে। টার্মিনাল আধুনিকায়ন হলে আরো কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা যায়। চুক্তি করা প্রতিষ্ঠানটি অনিয়ম করলে অবশ্যই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। বাংলাদেশের বন্দরসংক্রান্ত সব আইন কার্যকর থাকবে এখানে। আইন লঙ্ঘিত হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। বাণিজ্য ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সরকারের অগ্রাধিকার এবং বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রেখে বাণিজ্য ও লজিস্টিকস খাতে আরো নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বন্দরের বে টার্মিনাল, রেলসংযোগ, সরবরাহব্যবস্থা ও মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল উন্নয়নে ১০০ কোটি বা এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। টার্মিনালের কর্মদক্ষতা বাড়লে ব্যবসায়ীদের বিলম্ব মাশুলের ব্যয় কমবে। পণ্য খালাসে সময়ও কম লাগবে।
এতে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি খাত আরো প্রতিযোগিতামূলক হবে। আন্তর্জাতিক অপারেটর বন্দর পরিচালনা করলে সেবার মান বাড়বে, এটা বলা যায়। তবে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, এর ফলে মাশুল যাতে না বাড়ে। কারণ, মাশুল বাড়লে ব্যবসার খরচও বেড়ে যাবে। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের আগে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের দেশীয় অংশীদার রাখার বাধ্যবাধকতা যেন থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দেশীয় অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা যায়। এটা ঠিক, ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য যেসব বিদেশি অপারেটর আসছে, তারা নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজনে টার্মিনালগুলো আধুনিকায়ন করবে। তাতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আসবে। সেবার মানও বাড়বে। বিগত বছরগুলোতে চট্টগ্রাম বন্দরের অদক্ষতা বিস্ময়কর মাত্রায় বেড়েছে।
বন্দরের অদক্ষতা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার মাশুল গুনছেন আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা; এজন্য প্রতি বছরেই তাঁদের ক্ষতি হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। তাঁরা বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলোকে এই অর্থ পরিশোধ করছেন কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায়। এতে শুধু তাঁদেরই যে ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে, তা নয়, আমদানি করা পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে ভোক্তাসাধারণের ওপর।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের যখন এই দুরবস্থা, তখন চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘদিনের জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতেই যাচ্ছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল)। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ অনেক পুরনো; মাত্রাতিরিক্ত জাহাজের জট, পণ্য খালাসে অস্বাভাবিক মাত্রায় বিলম্ব, নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি নানা কারণে বহির্বিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তির অবনতি ঘটেই চলেছে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে থাকে। কিন্তু দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের এই দুরবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত: এর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মান উন্নত করতে হবে, সে জন্য দক্ষ, দায়িত্বশীল ও সৎ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে। বন্দরে লাইটার জাহাজ ও জেটির সংখ্যা বাড়ানোসহ অবকাঠামোগত ঘাটতিগুলো দূর করা প্রয়োজন।
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার পেছনে সরকারের মূল যুক্তিগুলো হলো, বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া আরো দ্রুত ও গতিশীল করা। লজিস্টিকস ও পোর্ট অবকাঠামো খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। একইসঙ্গে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনবলের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশিদের দিলে চট্টগ্রাম বন্দর যেমন লোকসানের দিকে যাবে ও দক্ষ কর্মশক্তি হারাবে তেমনিভাবে ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ বিপদের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা আছে।
এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিকে ইজারা দিলে সরকার আয় থেকে বঞ্চিত হবে, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাবে এবং ‘কনসেশন’ চুক্তির কারণে বিপজ্জনক পণ্য খালাসেরও আশঙ্কা রয়েছে। তাদের এমন দাবির বাস্তবতা, যৌক্তিকতা ও কতটা তা আমরা ভালোভাবে জানি। আমরা ইতোপূর্বে বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচণায় এক শ্রেণির রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত শ্রমিক সংগঠন বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য এবং অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত করে দেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও কাগজবিহীন ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ব্যয় কমানো, সেবায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত করা এবং দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আরো আধুনিক ও কার্যকর করতে বিদ্যমান ডিজিটাল সেবাগুলো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের আলাদা আলাদা ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা এবং বাকি থাকা ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং কোম্পানি, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট, পরিবহন প্রতিষ্ঠান, কাস্টমস ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োজন। বর্তমানে বন্দরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ইতোমধ্যে অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে জাহাজসংক্রান্ত সব বিল শতভাগ অনলাইনে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে। নতুন ওয়ান-স্টপ সেবা কেন্দ্রের সঙ্গে সোনালী ব্যাংক পিএলসির একটি সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে কনটেইনার ও গ্রাহক বিলিং ব্যবস্থাকে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আমদানিকারক ও তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা দিন-রাত যে কোনো সময় অনলাইনে বন্দরের ফি পরিশোধ করতে পারবেন। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনেও এই সুবিধা চালু থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না হলে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াও চালু করা হবে। আমদানি করা কনটেইনারের ডেলিভারি অর্ডার ব্যবস্থাপনাও ডিজিটাল করা হচ্ছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থাকে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকেরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিয়ে অনলাইনে নথির অগ্রগতি জানতে পারবেন। বন্দরের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে যানজট কমাতে চালু করা হচ্ছে সময়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, অনলাইন কার্ট টিকিট এবং ই-গেট পাস ব্যবস্থা। পাশাপাশি ইকুইপমেন্ট ইন্টারচেঞ্জ রিসিপ্টের সঙ্গে ই-গেট পাস যুক্ত করা হবে।
বিশেষ ডেলিভারি, কাস্টমস নিলামের পণ্য সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো কার্যক্রমও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমস ব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে সমন্বিত করা হচ্ছে। একটি আধুনিক বন্দর শুধু বড় অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না, বরং দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাই এর মূল শক্তি। ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজ আগমন, পণ্য খালাস, শুল্ক কার্যক্রম, অর্থ পরিশোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম বন্দর সম্পূর্ণ ডিজিটাল হলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ কমবে, পণ্য পরিবহনে গতি বাড়বে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের চাপ সামলাতে এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট লজিস্টিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চট্টগ্রাম বন্দরের এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চূড়ান্ত আলোচনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা, স্বার্থ ও কল্যাণ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়েছে। এ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ই উপক্ষো করা হয়নি। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বৈশ্বিক অপারেটর যুক্ত হলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি এবং বন্দর খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড সময় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, ট্রাকের টার্ন অ্যারাউন্ড সময় ধীরে ধীরে ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনা হবে। ক্রেনের উৎপাদনশীলতা দ্বিতীয় বছর থেকে উন্নত হবে।
ভোগান্তি কমাতে কাগজবিহীন কার্যক্রম চালু হবে। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় বিদ্যমান শূন্য অবস্থানে রাখতে সক্ষম হবে। চুক্তির পর কোনো কর্মী ছাঁটাই করা হবে না। বরং কনসেশন চুক্তিতে বিদ্যমান কর্মীদের সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়নে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় কিছু কিছু রাজনৈতিক সংগঠন আন্দোলনের নামে দেশের অগ্রগতি রুখে দিতে তৎপর সবসময়ে। দেশে এখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই সরকার দেশের অগ্রগতির স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব একাজে দক্ষ ও অভিজ্ঞ একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে প্রদান তারা অংশ বলে মনে করছি। এখানে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কিছু সম্পন্ন হয়নি, নিশ্চিত করে বলা যায়।
লেখক : কথাসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









