দেশের মোট জনসংখ্যার এক দশমাংশ বা এক কোটি ৬০ লাখ ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিকের অধিকাংশের প্রতিই অবহেলা, পরিচর্যার অভাব, সম্পত্তি বঞ্চনা, বৈষম্য এবং শারীরিক-মানসিক ও মৌখিক নির্যাতন বেড়েই চলেছে।
তাদের গায়ে হাত তোলা বা মারধর করা, কটূক্তি করা, অপমান করা বা ভয় দেখানো ছাড়াও প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ বা সঙ্গ না দিয়ে ফেলে রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের সম্পত্তি বা পেনশনের টাকা জোরপূর্বক বা ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি-প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎও করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, প্রতি ছয়জন প্রবীণের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতন বা অবহেলার শিকার হন।
এই বাস্তবতায় সোমবার (১৫ জুন) পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ সচেতনতা দিবস’। প্রতি বছর ১৫ জুন জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত হয়ে আসা দিবসটির লক্ষ্য হচ্ছে, প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা, অবহেলা, আর্থিক শোষণ, মানসিক ও মৌখিক নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিসহ তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
দিবসটি ঘিরে দেশেও প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে শক্তিশালী নাগরিক উদ্যোগ নিয়েছে রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক), নবীণ-প্রবীণ আন্ত:প্রজন্ম স্বনির্ভর ক্লাব (আইএসএসসি), ফোরাম ফর দ্য রাইটস অব দ্য এল্ডারলি, বাংলাদেশ (এফআরইবি)।
এ লক্ষ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে উন্নয়ন সংস্থাগুলো। তারা ছাড়াও ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে অংশ নেন বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (বাইগাম), নেটওয়ার্ক অব হেল্পএইজ পার্টনারস ইন বাংলাদেশ (এনএইচপিবি), নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম (নাসফ) ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্য ও উন্নয়নকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং তরুণ-তরুণী ও প্রবীণ নাগরিকেরা।
মানববন্ধনে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রবীণ নারী-পুরুষের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতনের ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত কিছু মর্মান্তিক ঘটনা প্রবীণদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ এখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘সচেতনতার গণ্ডি পেরিয়ে: প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধকে কার্যকর করি’-এর আলোকে প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধের নানা দাবি তুলে ধরেন মানবন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা।
প্রবীণ বান্ধব সমাজ গঠনে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা, ২০১৩’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, ‘‘প্রবীণদের ওপর নির্যাতনের বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। এতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসহায় হয়ে পড়েন তারা। তাই প্রতিবাদ নয়, এটি রোধে রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা তৈরি হওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে পাড়া-মহল্লা ও সেবাদাতা সংস্থাগুলোকেও সমানভাবে সচেতন হতে হবে।’’
বক্তারা বলেন, ‘‘তবে, আমরা শুধু সচেতনতা ও তথ্যের মধ্যেই বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। সচেতনতার গণ্ডি পেরিয়ে সরকার ও সমাজ যেন প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধকে কার্যকর করে।’’
জার্মান ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিএমজেড) ও হেল্পএইজ জার্মানির সহযোগিতায় রিকের ‘ইমপ্রুভড ইনকাম সিকিউরিটি থ্রু স্ট্রেনদেনদ্ ইন্টারজেনারেশনাল গ্রুপস ফর ওল্ডার পিপল ইন বাংলাদেশ (আইএসআইজিওপি) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় নবীন-প্রবীণের আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি গড়ে তুলতে গত আড়াই বছর ধরে কাজ করে আসছে রিক। আন্তঃপ্রজন্ম স্বনির্ভর ক্লাবের মাধ্যমে এই নবীন-প্রবীণ সম্মিলনীতে উন্মোচিত হচ্ছে প্রবীণদের নির্যাতন প্রতিরোধ এবং সুরক্ষা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্ত।
প্রকল্পটির জাতীয় সমন্বয়কারী গবেষক তোফাজ্জল হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘‘প্রবীণেরা একটি জাতির অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মূল্যবোধের ভাণ্ডার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তাদের অবদান অপরিসীম। অথচ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেকেই অবহেলা-নির্যাতন, একাকিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন। এটি তাই কেবল পারিবারিক সমস্যাই নয়, সামাজিক ব্যাধিও।’’
তার মতে, প্রবীণদের সুন্দর ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং পারিবারিকভাবে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিএমজেড ও এইচএডির সহযোগিতায় মানববন্ধনে আরও অংশ নেন ঢাকার খিলগাঁও আন্তঃপ্রজন্ম স্বনির্ভর ক্লাবের সভাপতি হাফিজুর রহমান ময়না, খালেদুল ইসলাম, ফেরদৌসি বেগম গীতালি, অসীম সাহা, খন্দকার রিয়াজ হোসেন, মো. মুখলেছুর রহমান, তাসলিমা আহমেদ, আনিছুর রহমান প্রমুখ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









