জুমের শস্য, পাহাড়ি মধু, বাঁশকোঁড়ার পদ, হেবাঙ, পাজন, বিনি চালের পিঠা কিংবা ফলের ঝাল লাকসো—আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি ও কৃষিজ ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে রাজধানীতে বসছে পঞ্চম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা।
খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ নয়; একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, প্রকৃতি, জীবনযাপন ও সংস্কৃতিরও পরিচয় বহন করে।পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ, বনের ফলমূল, স্থানীয় শস্য, নিজস্ব রান্নার কৌশল আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা খাদ্যাভ্যাস—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতির সঙ্গে নগরবাসীর পরিচয় ঘটাতে রাজধানীতে বসছে ‘পঞ্চম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা-২০২৬’।
৬ ও ৭ নভেম্বর, শুক্র ও শনিবার, মিরপুর ১৩-এর পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে দুই দিনব্যাপী এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ ও আদিবাসী সুহৃদদের যৌথ আয়োজনে মেলায় পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবার, শস্য, কৃষিপণ্য ও হস্তনির্বাচিত খাদ্য উপকরণের সমাহার থাকবে।

খাবারের স্বাদে সংস্কৃতির পরিচয়
পাহাড়ি রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার এবং খাবারের নিজস্ব স্বাদ অক্ষুণ্ন রাখা। তেল-মসলার অতিরিক্ত ব্যবহার ছাড়াই প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া উপাদান দিয়ে তৈরি হয় অনেক ঐতিহ্যবাহী পদ। এবারের মেলায় দর্শনার্থীরা পরিচিত হতে পারবেন এমনই নানা রান্নার সঙ্গে।
পাহাড়ের জনপ্রিয় বাঁশকোঁড়া বা ব্যাম্বু শুট দিয়ে তৈরি খাবার থাকবে মেলার অন্যতম আকর্ষণ। কলাপাতায় মোড়ানো ও রান্না করা বিভিন্ন পদের হেবাঙ, জুমে উৎপাদিত নানা ধরনের শাকসবজি দিয়ে তৈরি খাবার এবং পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পাজনের স্বাদ নেওয়ার সুযোগও থাকবে।বিশেষ করে পাজন শুধু একটি খাবার নয়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যঐতিহ্য ও পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও পরিচায়ক।
পাহাড়ের পাশাপাশি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবারও মেলায় তুলে ধরা হবে। মণিপুরি, গারো ও রাখাইন উদ্যোক্তারা তাদের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির নানা পদ নিয়ে হাজির হবেন। রাখাইনদের কালো ও সাদা বিনি চাল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পিঠা থাকবে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে। থাকবে বিভিন্ন জাতের বিনি চালের সমাহারও।
ইদানীং বাঙালি ভোজনরসিকদের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের মুন্ডি। মেলায় এসব খাবারের পাশাপাশি পাওয়া যাবে নানা রকম টাটকা ফল দিয়ে তৈরি ঝাল পদ, যা ‘লাকসো’ নামে পরিচিত। পাহাড়ি মধু, শুঁটকি এবং নানা ধরনের স্থানীয় খাদ্য উপকরণও পাওয়া যাবে।
জুমের শস্য, প্রকৃতির উপহার

আদিবাসী খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের কৃষি ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন। পাহাড়ের ঢালে জুমচাষের মধ্য দিয়ে উৎপাদিত হয় নানা জাতের ধান, শস্য, শাকসবজি ও ফলমূল। স্থানীয় পরিবেশ, ঋতু ও মাটির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানিয়ে গড়ে উঠেছে এই কৃষিব্যবস্থা। এর মধ্যেই সংরক্ষিত রয়েছে বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান।
মেলায় জুমচাষে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফলমূল, শস্য, শুঁটকি এবং বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসবেন উদ্যোক্তারা। এসব পণ্যের মধ্য দিয়ে নগরবাসী যেমন নতুন নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন, তেমনি জানতে পারবেন পাহাড়ের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের নিজস্ব ধারার কথাও।
আয়োজকদের একজন রেলী চাকমা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলার স্টল বরাদ্দের খবর প্রচারের পর থেকেই উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলের পাশাপাশি সমতলের মান্দি, মণিপুরি, সাঁওতাল ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর অনেক উদ্যোক্তা ইতিমধ্যে স্টল বুকিং দিয়েছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এবারও অনেক আদিবাসী নারী উদ্যোক্তা মেলায় অংশ নিচ্ছেন।

নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ
আদিবাসী নারীরা তাদের পরিবারের খাদ্যসংস্কৃতি, কৃষিকাজ ও ঐতিহ্যবাহী রান্নার রীতিনীতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় শস্য প্রক্রিয়াজাত করা, মৌসুমি খাবার তৈরি, ফলমূল ও কৃষিপণ্য বাজারজাত করা—এসব কাজের মধ্য দিয়ে তারা একদিকে পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখেন, অন্যদিকে গড়ে তোলেন নিজেদের অর্থনৈতিক উদ্যোগ।
মেলায় তাদের অংশগ্রহণ সেই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করবে। নিজস্ব এলাকার খাবার ও কৃষিপণ্য সরাসরি নগরবাসীর কাছে তুলে ধরতে পারবেন তারা। একই সঙ্গে ক্রেতাদের সঙ্গে তৈরি হবে নতুন যোগাযোগ, যা ভবিষ্যতে তাদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জানান, শহুরে মানুষের সঙ্গে আদিবাসীদের সমৃদ্ধ জুম কৃষি, শস্য ও খাদ্যসংস্কৃতির পরিচয় ঘটানোই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। আদিবাসী উদ্যোক্তারা যেন আরও বেশি ভোক্তার কাছে তাদের পণ্য পৌঁছে দিতে পারেন, সে লক্ষ্যও রয়েছে। তার ভাষায়, এ বছর আয়োজনটি টানা পঞ্চম বছরে পদার্পণ করছে। এরই মধ্যে রাজধানীবাসীর কাছে মেলাটি বেশ সমাদৃত হয়েছে।
আয়োজকদের আরেকজন মেইনথিন প্রমীলা মনে করেন, বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় খাদ্যঐতিহ্য। এই খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও যোগাযোগ বাড়ানো এবং পারস্পরিক খাদ্যাভ্যাসের মেলবন্ধন তৈরি করাই মেলার অন্যতম লক্ষ্য।
খাবারের পাশাপাশি থাকবে সাংস্কৃতিক আয়োজন
খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা মেলায় উপভোগ করতে পারবেন আদিবাসীদের গান, নাচ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দুই দিনই সন্ধ্যায় থাকবে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে সংগীত পরিবেশন করবেন বাংলাদেশ আইডল মং, পাহাড়ের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা এবং গারো জনগোষ্ঠীর উদীয়মান সংগীতশিল্পী মার্কুস চিসিম।

এ ছাড়া পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনা থাকবে। এসব পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীরা তাদের সংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
৬ নভেম্বর সকাল ১০টায় মেলার উদ্বোধন করবেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
কীভাবে যাবেন
মেলার স্থান মিরপুর ১৩-এর পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ। মেট্রোরেলের মিরপুর ১০ স্টেশন থেকে রিকশায় প্রায় পাঁচ মিনিটে সেখানে পৌঁছানো যাবে। কমপ্লেক্সের পাশেই রয়েছে স্কলাসটিকা ও এসওএস শিশুপল্লী। বিপরীত দিকে বিআরটিএর কার্যালয়।

দুই দিনের এই আয়োজন তাই কেবল খাবারের মেলা নয়; বরং বাংলাদেশের নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, কৃষিজ্ঞান, খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ। পাহাড় ও সমতলের মানুষের নিজস্ব স্বাদ, শস্য ও ঐতিহ্যকে একই প্রাঙ্গণে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে মেলাটি হয়ে উঠতে পারে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগের এক আনন্দময় পরিসর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









