হাপরের টানে দাউ দাউ করে জ্বলছে কয়লার চুলা। তপ্ত আগুনে লোহা হয়ে উঠছে লালচে দীপ্ত। সেই গরম লোহায় দিন-রাত হাতুড়ি পেটানোর ‘টুং-টাং’ শব্দে এখন মুখর বান্দরবানের লামা বাজারের কামারপল্লী। পবিত্র ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কামারদের ব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় দা, ছুরি, বঁটি ও চাপাতি তৈরি এবং পুরোনোগুলোতে শান দিতে দিন-রাত কাজ করছেন স্থানীয় কারিগররা।
বান্দরবান জেলার অন্যতম বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র লামা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে কয়লার গন্ধ আর হাতুড়ির ‘টুং-টাং’ শব্দ। তপ্ত লোহা পিটিয়ে নতুন সরঞ্জাম তৈরিতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই কামারদের।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব সরঞ্জাম তৈরিতে মূলত দুই ধরনের লোহা ব্যবহার করা হয়- স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা। স্প্রিং লোহার তৈরি সরঞ্জাম বেশি টেকসই হওয়ায় এর চাহিদা ও দাম তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে কাঁচা লোহার জিনিসের দাম কম। এছাড়া দা, ছুরি, কাটারি, বঁটি ও কুঠার তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে অ্যাঙ্গেল, ব্ল্যাকবার, রড, স্টিল, রেললাইনের লোহা এবং গাড়ির পাত (স্প্রিং) ব্যবহার করা হয়।
বাজার ঘুরে জানা গেছে, আকার ও মানভেদে বিভিন্ন ধরনের দা, ছুরি ও চাপাতি ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি ওজনের লোহার তৈরি বঁটি দা বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। মাঝারি আকারের টাকসাল দার দাম ৯০০ টাকা। সাধারণ বঁটি দা ৫০০ টাকা এবং কোপের দা ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাংস কাটার জন্য ব্যবহৃত চাপাতি প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং পিস হিসেবে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পশু জবাইয়ের বড় ছুরির দাম ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা। কিছু বড় ছুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছোট ছুরির দাম ৫০ থেকে ২০০ টাকা। এছাড়া সাধারণ দা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং হাঁসুয়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লামা বাজারের কামার কালীশঙ্কর কর্মকার বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে গেলেও কোরবানির ঈদে কামার শিল্পের কদর বাড়ে। কেউ নতুন সরঞ্জাম কিনছেন, আবার কেউ পুরোনোগুলোতে শান দিচ্ছেন। তবে লোহা ও কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিশ্রম অনুযায়ী লাভ হচ্ছে না।
আরেক কামার লিটন কর্মকার বলেন, বছরের এই সময়টাই তাদের মূল আয়ের মৌসুম। নতুন দা-বঁটি তৈরি ও পুরোনোগুলোতে শান দেওয়ার কাজে এখন খুব ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। মানুষের বিশ্বাস, হাতে তৈরি লোহার সরঞ্জাম বেশি টেকসই এবং ধারও দীর্ঘদিন থাকে।
তবে তিনি জানান, কাজের চাপ বেশি থাকলেও শ্রমিক সংকট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন প্রজন্ম এই কষ্টসাধ্য পেশায় আসতে চায় না। ফলে দিন দিন কামার শিল্পে শ্রমিকের অভাব বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
দা-ছুরি কিনতে আসা ক্রেতা মাসুদুর রহমান বলেন, কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে এবং পুরোনোগুলোতে শান দিতে এসেছি। বছরে এই একবারই কামারদের কাছে আসা হয়। এতে কোরবানির কাজ সহজ হয় এবং পরিবারের সদস্যদেরও সুবিধা হয়।
এদিকে ঈদের আগে কামারদের ব্যস্ততার মধ্যেও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘনঘন লোডশেডিং। বিদ্যুৎ না থাকায় বৈদ্যুতিক শান মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্র ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। এতে কাজের গতি কমে যাচ্ছে, সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো অর্ডার বুঝিয়ে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কারিগররা। তাই ঈদের আগের দিনগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









