বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাসে বিশ্বাস করে এবার চামড়া সংগ্রহে নেমে আমরা বড় বিপদে পড়েছি। মন্ত্রী বলেছিলেন চামড়া প্রতি ফুট ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি করা যাবে। কিন্তু বাজারে এসে মন্ত্রীর কথার কোনো প্রতিফলনই দেখলাম না, ওনার আশ্বাসে আমরা ‘জিরো’ পেয়েছি! ব্যবসায়ীরা এক-একটি গরুর চামড়ার দাম হাঁকছেন মাত্র ৪০০ টাকা। এই টাকায় আমাদের গাড়ি ভাড়াও উঠছে না।
পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে বরিশালের প্রধান চামড়া পট্টি, নগরীর পোর্ট রোডে চামড়া বিক্রি করতে এসে এমন চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছিলেন নবগ্রাম রোডের একটি মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা জুবায়ের আব্দুল্লাহ।
শুধু মাওলানা জুবায়ের নন, বরিশালের চামড়া বাজারে এবার চামড়া বিক্রি করতে এসে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ চরম বিপাকে পড়েছেন। ন্যায্য মূল্য না পেয়ে অনেকে ক্ষোভে-দুঃখে চামড়া, ব্যবসায়ীদের আড়তেই ফেলে রেখে চলে গেছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একাধিক মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আগামী কোরবানি থেকে তারা আর চামড়াই সংগ্রহ করবেন না।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুরের পর থেকেই ভ্যান, রিকশা ও ইজিবাইকে করে বরিশালের বিভিন্ন এলাকা থেকে পোর্ট রোডে চামড়া আসতে শুরু করে। তবে বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও ক্রেতাদের মাঝে ছিল চরম উদাসীনতা।
বটতলা এলাকার খাজা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের কুদরত আলী জানান, সারাদিন রোদে পুড়ে মেহনত করার পর যদি ৪০০ টাকা দরে চামড়া বিক্রি করতে হয়, এর চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই। আমাদের একেকজন এতিম ছাত্রের পেছনে দিনে ২৫০ টাকা খরচ। চামড়া বিক্রি করে যদি গাড়ি ভাড়াই না থাকে, তবে বোর্ডিং চলবে কী করে?
একই সুর মুসলিম গোরস্তান লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের আবুল হোসেনের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের কাছে দানশীল ব্যক্তিরা চামড়া দিয়ে যান। এবার বাজারে এসে দেখি গরুর চামড়ার সাথে ছাগলের চামড়া ফ্রিতে দিয়ে দিতে হচ্ছে। ছাগলের চামড়ার কোনো দামই নেই।’’
বিক্রেতাদের এমন ক্ষোভের জবাবে আড়তদার ও চামড়া ব্যবসায়ীরা তুলে ধরেছেন তাদের নিজেদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার গল্প। তাদের দাবি, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে গত বছরের প্রায় ৮০ শতাংশ টাকা পাওনা থাকায় তারা তীব্র পুঁজি সংকটে ভুগছেন। লোকসানের ভয়ে তারা চামড়া কিনতেই সাহস পাচ্ছেন না।
পোর্ট রোডের চামড়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নাসির বলেন, ‘‘ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে গত বছরের মাত্র ২০-২৫ ভাগ টাকা পেয়েছি। আমাদের ব্যবসা এখন বন্ধের পথে। আড়তে ৭টি চামড়া আসলে আমরা ১টি রাখছি, বাকি ৬টি ছেড়ে দিচ্ছি। গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় কিনলেও ছাগলের চামড়ার কোনো বাজার নেই। আগে বরিশালে চামড়া ব্যবসায়ী ছিল ১৫০ থেকে ২০০ জন, ট্যানারির টাকা না পেয়ে এখন টিকে আছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন।
পোর্ট রোড থেকে কেনা চামড়াগুলো প্রথমে বালুর ঘাটে এনে কীর্তনখোলা নদীর পানিতে পশুর রক্ত ধুয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে। এরপর ট্রলারে করে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রসূলপুরে। সেখানে লবণ দিয়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের (সল্টিং) কাজে শ্রমিকদের ব্যস্ততা দেখা গেলেও আগের সেই জৌলুস আর নেই।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শ্রমিক আবু বক্কর আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘গত ৪-৫ বছর ধরেই চামড়ার বাজারের এই মরণ দশা। বছর বছর চামড়া ব্যবসায়ী কমছে, আমাদের কাজও কমছে। আগে যেখানে বরিশালে ৫০০ শ্রমিক চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করত, এখন সেখানে কাজ করছে সর্বোচ্চ ৩০ জন।’’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙা, বকেয়া টাকা আদায় এবং সরকারি নজরদারি জোরদার করা না গেলে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই চামড়া শিল্প বরিশাল অঞ্চল থেকে অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









