সমুদ্রের নোনা হাওয়া, পাহাড়ের ছায়া আর প্রখর রোদের মেলবন্ধনে মহেশখালী যেন এক জীবন্ত রান্নাঘর। এখানে রোদ শুধু আলো দেয় না, রোদে জন্ম নেয় স্বাদ, জন্ম নেয় শুঁটকি। তাই বহুদিন ধরেই মানুষের মুখে মুখে একটি কথা- শুঁটকি মানেই মহেশখালী।
কক্সবাজারের নীল জলরাশি ছুঁয়ে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন মহেশখালীর পথ ধরে ঘুরে দাঁড়ান, তখন তাদের হাত খালি থাকে না। শুঁটকি আর মিষ্টি পান, এই দুটি জিনিস যেন দ্বীপ থেকে ফেরার নীরব স্মারক। প্রিয়জনের জন্য, নিজের জন্য, ব্যাগভর্তি করে নেয়া হয় রোদের স্বাদ।
ভোজনরসিক বাঙালির খাবার তালিকায় শুঁটকি শুধু একটি উপকরণ নয়, এটি এক ধরনের আবেগ। ভর্তায়, ভুনায় কিংবা আচারে, শুঁটকির ঘ্রাণে জেগে ওঠে সমুদ্র স্মৃতি। আর আজ সেই স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি নাম, অর্গানিক শুঁটকি।
এখানকার শুঁটকিতে নেই লবণ-বিষ, নেই ফরমালিন কিংবা ক্ষতিকর কোনো কেমিক্যাল। সূর্যই এর একমাত্র আগুন, বাতাসই একমাত্র সংরক্ষণকারী। তাই মাছের স্বাদ থাকে অবিকৃত, পুষ্টি থাকে অটুট। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরা ক্রমেই ঝুঁকছেন মহেশখালীর এই বিশুদ্ধ শুঁটকির দিকে।
শুঁটকি শ্রমিক মুজাম্মেল হক বলেন, “প্রতিদিন সকালে আমরা মাছ পরিষ্কার করি, রোদে শুকাই। যদিও কঠিন, কিন্তু আমাদের আনন্দ আছে, স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি তৈরি করছি, যা দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ।”
মহেশখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহেদুল ইসলাম জানান, সোনাদিয়ার শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। যেন উদ্যোক্তারা নিরাপদ ও মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদন করতে পারেন।
ড্রায়িং হাউসগুলো যেন শিল্পীর স্টুডিও। বাঁশের চাঙে সাজানো মাছগুলো রোদের সঙ্গে ধীরে ধীরে কথোপকথন চালায়। সাত থেকে আট দিনের ন্যাচারাল সানড্রাই শেষে তারা হয়ে ওঠে শুঁটকি, রোদে পোড়া নয়, রোদে পাকা। শুকানোর পর উন্নত ভ্যাকুয়াম প্যাকেটবন্দি হয় এই স্বাদ, যেখানে অক্সিজেন নেই, নেই পোকা বা জীবাণুর সুযোগ। ফলে দীর্ঘদিন সতেজ থাকে শুঁটকি, ঠিক যেমন সদ্য রোদ থেকে নামানো।
মহেশখালী উপজেলার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর রূপন কান্তি পাল বলেন,“রাসায়নিকবিহীন শুঁটকি নিয়মিত খেলে প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টিগুণ বজায় থাকে। এর মধ্যে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান থাকায় ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।”
অর্গানিক শুঁটকির দাম সাধারণ শুঁটকির চেয়ে বেশি- এ কথা সত্য। কিন্তু ওজনে নয়, সংখ্যায় হিসাব করলে পার্থক্য খুব বেশি থাকে না। সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি লুকিয়ে আছে নিরাপত্তায়। কারণ এটি নিছক খাবার নয়, এটি বিশ্বাস।
গাজীপুর থেকে আসা মুসলেম উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারে এলে মহেশখালীতে আসতেই হয়। শুঁটকি ছাড়া ফেরা যায় না। নিজের জন্য নয়, আত্মীয়স্বজনের জন্যও নিতে হয়।
মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের স্বর্ণদ্বীপখ্যাত সোনাদিয়া যেন শুঁটকির রাজ্য। বিস্তীর্ণ চরে রোদের নিচে সারি সারি মাছ, কেউ ধুচ্ছে, কেউ কাটছে, কেউ রোদে সাজাচ্ছে। শ্রমিকদের হাতে ঘাম, চোখে অভিজ্ঞতা, আর কাজে শতাব্দীর উত্তরাধিকার।
স্থানীয় আবু শাহেদ মিশাল বলেন, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ শুঁটকি আসে এই দ্বীপ থেকেই। তরতাজা মাছ কেটে, কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই তৈরি হয়।
মহেশখালীর অর্গানিক ড্রাই ফিশ দোকানের মালিক ফয়সাল জানান, প্রতি সপ্তাহে কয়েক টন শুঁটকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। আমরা চাই, অর্গানিক শুঁটকিকে আরও জনপ্রিয় ও টেকসই করা হোক।
রোদ, হাওয়া আর মানুষের ঘামের মিশেলে মহেশখালীর শুঁটকি শুধু খাবার নয়, এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্য। তাই আজও বলা হয়, শুঁটকি মানেই মহেশখালী।

সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন







