ঈদের ছুটি মানেই পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ ভ্রমণ। আর সেই আনন্দকে পূর্ণতা দিতে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ভিড় জমিয়েছেন লাখো পর্যটক। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে তারা মেতে উঠেছেন সমুদ্রস্নান, খেলাধুলা, ফটোগ্রাফি ও বিনোদনের নানা আয়োজনে।
পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে যতদূর যায় চোখ, শুধু মানুষের সমাগম। প্রচণ্ড গরম ও তীব্র রোদ উপেক্ষা করে হাজারো ভ্রমণপিপাসু নেমেছেন নোনাজলের উচ্ছ্বাসে। কেউ সমুদ্রে গোসল করছেন, কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, আবার কেউ মেতেছেন ঘোড়ায় চড়া, বিচ বাইক ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে।
ঈদের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও ছুটির তৃতীয় দিন থেকে বদলে যায় পুরো চিত্র। সৈকতের সুগন্ধা, লাবণী, কলাতলী, দরিয়ানগর ও হিমছড়িসহ বিভিন্ন পয়েন্টে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে পুরো সৈকত এলাকায়। এতে স্বস্তি ফিরেছে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মুখে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আহমেদ সুলতান বলেন, “ঈদের ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার জন্য কক্সবাজারই আমার প্রথম পছন্দ। নীল সমুদ্রের বিশালতা আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে যেতে সবারই ভালো লাগে। বিশেষ করে সমুদ্রের গর্জনের যে অনুভূতি, তা শুধু কানে শুনে নয়, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। সেই অনন্য অনুভূতির টানেই বারবার কক্সবাজারে ছুটে আসি।”
দিনাজপুর থেকে ভ্রমণে আসা শাহীন দেলোয়ার বলেন, “ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে এসে খুব ভালো লাগছে। সৈকতে মানুষের উপস্থিতি উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে। ঘোড়ার পিঠে চড়ার অভিজ্ঞতাও নিয়েছি। কিছুটা ভয় লাগলেও অভিজ্ঞতাটি ছিল বেশ রোমাঞ্চকর।”
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক মনিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী বলেন, “প্রিয়জনদের সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে সময় কাটানোর আনন্দই অন্যরকম। ঘোড়ায় চড়া, বিচ বাইকে ঘোরাসহ বিভিন্ন বিনোদন উপভোগ করেছি। এখানকার পরিবেশ ও সৌন্দর্য আমাদের ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছে।”
কুমিল্লা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা শাহেদ সেলিম বলেন, “স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। পরিবারের সঙ্গে এমন আনন্দঘন সময় কাটাতে পেরে খুব ভালো লাগছে।”
পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে সৈকতকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও।
জেট স্কি চালক জাফর আলম বলেন, “ঈদের ছুটিতে দীর্ঘদিন পর সৈকতে এত বেশি পর্যটকের সমাগম দেখে আমরা আনন্দিত। সামনের কয়েকদিন এমন ভিড় থাকলে ভালো ব্যবসা হবে। সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার কারণে পর্যটক কম থাকায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। ঈদের পর্যটক সমাগম সেই ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে দিতে সহায়তা করবে।”
সৈকতের ফটোগ্রাফার রহিম উদ্দিন বলেন, “ঈদের আগে পর্যটক কম ছিল। এখন পর্যটকের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ব্যবসাও ভালো চলছে। প্রতিদিনই পর্যাপ্ত আয় হচ্ছে। আশা করছি, ছুটির বাকি দিনগুলোতেও পর্যটকদের উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে।”
অন্যদিকে, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন লাইফগার্ড কর্মীরা। তারা সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপদ জোনে অবস্থান করে সমুদ্রে গোসল করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার প্রজেক্ট কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “বেলা ১১টার পর থেকে সাগরে জোয়ার চলছে। জোয়ারের কারণে ঢেউয়ের উচ্চতা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নেই। পর্যটকদের একটি বড় অংশ সমুদ্রে নেমে গোসল করছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২৭ জন লাইফগার্ড কর্মী নিরলসভাবে কাজ করছেন। তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।”
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঈদের ছুটির বাকি দিনগুলোতে কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই আনন্দময় ভ্রমণের পাশাপাশি সমুদ্রস্নানের সময় সতর্কতা অবলম্বন এবং লাইফগার্ডদের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঈদের উৎসবমুখর পরিবেশে কক্সবাজার এখন যেন এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকত, যা নতুন করে প্রাণ ফিরিয়েছে জেলার পর্যটন অর্থনীতিতে।এই সংস্করণটি সরাসরি পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা নিউজ বুলেটিনে প্রকাশের উপযোগী করে সম্পাদনা করা হয়েছে।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘‘ঈদুল আজহা উপলক্ষে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সৈকতের লাবণী, কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ট্যুরিস্ট স্কোয়াডের পাশাপাশি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি), মোবাইল টিম ও স্ট্যান্ডবাই টিম কাজ করছে। কোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সব ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









