খাগড়াছড়িতে খাল খনন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে কর্মসূচি বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ঠদের বিরুদ্ধে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা ও স্থানীয় মেম্বার ছানাউল্যাহ’র বিরুদ্ধে অভিযোগ কাজে অনুপস্থিত থাকা শ্রমিকদের বেতন তুলে পকেট ভরছেন।
জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর পরিচালিত অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পের আওতায় মোট ৯ দশমিক ১ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পিলাক খাল পুনঃখননে ব্যয় হবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং এতে কাজ করছেন ৪১৬ জন শ্রমিক। অন্যদিকে ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ তৈইমাতাই খাল পুনঃখননে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যেখানে নিয়োজিত আছে ৩৫৭ জন শ্রমিক। স্থানীয় শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্মরত প্রতিটি শ্রমিক দৈনিক ৫০০ টাকা হারে মজুরি পাচ্ছেন।
২ নং হাফছড়ি ইউপির ৬ নং বড়পিলাক ওয়ার্ড মেম্বার ছানাউল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ, খাল খনন কর্মসূচিতে তার শ্যালক, শালিকা ও ছেলের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। তারা কেউ কাজে না গেলেও বেতন ঠিকই তুলে নিচ্ছেন। পিলাক খালের অংশে যে কাজ হচ্ছে সে কাজের একাধিক শ্রমিকের বেতনের টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করছেন। তাদের অনেকেই জানেনই না খাল খনন কর্মসূচিতে তাদের নাম রয়েছে।
বড়পিলাক এলাকার মো. মেজবাহ উদ্দিন পিতা মৃত আ. হাই তার নাম রয়েছে খাল খনন কর্মসূচিতে। তিনি জানেন না তার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কোনোদিন কাজেও যাননি বলে জানান তিনি। তবুও তার নামে মজুরি হিসাবে টাকা তুলছেন ছানাউল্লাহ।
বেতনের কত টাকা পেয়েছেন এমন প্রশ্নে জানান মেজবাহ উদ্দিন জানান, ছানাউল্যাহ তার কাছ থেকে এনআইডি ও ছবি নিয়েছেন। ঈদের আগে ১ হাজার টাকা দিয়েছেন। ব্যাংকের চেকে সই নিয়েছেন আরও আগে।
একই পরিবারের একাধিক ব্যাক্তি, রাজনৈতিক নেতার বউ, শিক্ষক, মুদি দোকানদার, চাকরিজীবীদের নাম খাল খনন কর্মসূচিতে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ফলে বাদ পড়েছেন প্রকৃত অতি দরিদ্ররা।
সূত্রে জানা যায়, গুইমারা উপজলায় তৈমাতা ও পিলাক খাল খননে কাজের ব্যয় ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। শ্রমিক কাজ করবেন ৭ শত ৭৩ জন। কিন্তু অভিযোগ আছে ৭ শত ৭৩ জনের বিপরীতে কাজ করছে অর্ধেকেরও কম শ্রমিক। এসব কাজ না করা শ্রমিকের টাকা উত্তোলন করে ভাগ বাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বাস্তবে এ প্রকল্প সরকারি অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। সরেজমিনে রবিবার (৩১ মে) খাল খনন কর্মসূচিতে গেলে ৪১৬ জনের বিপরীতে ১৮০ জনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
কাজের তদারকিতে থাকা মাঝি মো. মোস্তফা জানান, ঈদের পর তাই অনেকে আসেননি। কাজে অনুপস্থিত কিন্তু হাজির দেখিয়ে বেতন উত্তোলন ও ভাগভাটোয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমার অধিনে যারা কাজ করে তারা না আসলে অনুপস্থিত থাকে। বেতন দেওয়া হয়না। কেউ কেউ অনপস্থিত শ্রমিকের টাকা উত্তোলন করেছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করেছি।
জানা যায়, ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পিলাক খাল পুনঃখননে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে ৪শত ১৬ জন শ্রমিক কাজ করবেন। অন্যদিকে ৪.১ কিলোমিটার দীর্ঘ তৈইমাতাই খাল খননে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং এতে কাজ করবেন ৩ শত ৫৭ জন শ্রমিক।
অপরদিকে সরেজমিন দেখা গেছে, খালের মুখের অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়নি। খাল খননের স্থলে খালের দুপাশের জঙ্গল পরিস্কার করা হচ্ছে। ফলে খননের পরও শুরুতেই পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু স্থানে খালের ভেতরে থাকা স্থাপনা রেখেই পাশ ঘেঁষে খনন করা হয়েছে। প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করেই খাল খনন করায় প্রকল্পের সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তাদের অবৈধ স্থাপনা অক্ষত রেখেই খননকাজ করা হচ্ছে। ফলে কোথাও কোথাও মূল খালের এক পাশ কেটে দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে অভিযুক্ত ছানাউল্যাহর মুঠোফোনে ফোন দিলে তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
গুইমারা উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
গুইমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিসকাতুল তামান্না বলেন, ‘‘খাল খনন কর্মসূচিতে কাজ না করে টাকা উত্তোলন ও অর্থ আত্মসাতের বিষয় প্রমানিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









