রবিবার (১৪ জুন) মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জবাসীর এক বুক চাপা আর্তনাদ আর ভয়াবহ স্মৃতির দিন। ঐতিহাসিক মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২৯তম বার্ষিকী। কালের পরিক্রমায় বর্ষপঞ্জির পাতা ঘুরে আবার ফিরে এসেছে সেই বিভীষিকাময় দিনটি। দেখতে দেখতে মাগুরছড়া বিপর্যয়ের খতিয়ানে যুক্ত হলো আরও একটি বছর।
তবে দীর্ঘ ২৯টি বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেনি সরকার। ফলে কমলগঞ্জবাসীর দীর্ঘশ্বাসের সাথে আজও মিশে আছে একরাশ ক্ষোভ আর অবহেলা।
১৯৯৭ সালের ১৪ই জুন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মাগুরছড়া গ্যাসকূপে ড্রিলিং কাজ চলাকালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠে কমলগঞ্জ। বিস্ফোরণের আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে উঠেছিল মৌলভীবাজার জেলার সুনীল আকাশ। ভীত-সন্ত্রস্ত লোকজন ঘরের মালামাল রেখে প্রাণভয়ে ছুটে ছিল দিগ্বিদিক।
আগুনের লেলিহান শিখায় লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল বিস্তীর্ণ এলাকা। আগুনে পুড়ে যায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল, চা বাগান ও খাসিয়া জুম। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রেলপথ, সড়কপথ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। পুড়ে যায় বনের দুর্লভ বন্যপ্রাণীসহ হাজার হাজার জীববৈচিত্র্য। দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মার্কিন গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল।
ক্ষয়ক্ষতির আংশিক পরিশোধ করলেও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি বন বিভাগ। সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ না দিয়েই ইউনিকলের কাছে হস্তান্তরের পর সর্বশেষ শেভরনের কাছে বিক্রি হয়েছে এই গ্যাসক্ষেত্র। শেভরন ২০০৮ সালে ওই বনে ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করে। এতেও স্থানীয়ভাবে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
২০১২ সালে শেভরন মৌলভীবাজার ১৪ নম্বর ব্লকের অধীনে নূরজাহান, ফুলবাড়ি এবং জাগছড়া চা বাগানের সবুজ বেষ্টনী কেটে কূপ খননের পর এসব কূপ থেকে চা বাগানের ভেতর দিয়ে ড্রেন খনন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তোলিত গ্যাস কালাছড়ার মাধ্যমে রশীদপুর গ্রিডে স্থানান্তর চলছে। মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির ২৯ বছরেও জনসম্মুখে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রকাশ হয়নি, আদায় হয়নি ক্ষতিপূরণ।
পরিবেশবীদদের তথ্যমতে, মাগুরছড়ার অগ্নিকান্ডে ৬৩ প্রজাতির পশুপাখির বিনাশ সাধন হয়। সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ১৬৩ দিন বন্ধ থাকে। মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। মার্কিন অক্সিডেন্টাল ক্ষয়ক্ষতির আংশিক পরিশোধ করলেও বন বিভাগ কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।
বিভিন্ন সংগঠন মাগুরছড়া দুর্ঘটনার যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করে এলেও দীর্ঘ ২৯ বছরেও ক্ষতিগ্রস্তদের দাবিকৃত ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানের জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। তৎকালীন সরকার ক্ষতিপূরণ আদায়ের জোরালো ভূমিকা পালন করেনি। ফলে মাগুরছড়া দুর্ঘটনার ২৯তম বার্ষিকী পূর্ণ হলেও ক্ষতিপূরণ আদায় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে আজও ক্ষতিপূরণ না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা নীরবে চোখের জল ফেলছে।
এ নিয়ে মৌলভীবাজার তথা সিলেটের জনমনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের পরিত্যক্ত এলাকার উত্তর টিলায় সবুজায়ন করা হয়েছে। মূল কূপটি এখনো পুকুরের মতো আকার ধারণ করে টিকে আছে। চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। টিলার ওপর সবুজ বনায়নের উদ্যোগ নিলেও সবুজায়ন হয়ে উঠেনি অগ্নিকান্ডের সাক্ষী মূল কূপের চারিপাশ।
গ্যাসকুপ বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জির বাসিন্দা জিডিসন প্রধান সুচিয়াং বলেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক বনের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা আমরা যারা এ বনে বসবাস করছি তারা ছাড়া কেউ বুঝার কথা নয়। এবং বুঝতেও পারবে না।
লাউয়াছড়া বন রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, মাগুরছড়া ট্রাজেডিতে প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি কোনো সময়ে পুষিয়ে ওঠার নয়। গ্যাসক্ষেত্রে অগ্নিকান্ডে এ বনের ক্ষতি নিরূপণ করা হলেও আমার জানামতে বনবিভাগ এ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে পরিবেশবাদী স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন ক্ষতিপূরণ আদায়ে এবং কমলগঞ্জের ঘরে ঘরে গ্যাস সরবরাহ এর দাবীতে রবিবার দুপুরে মানববন্ধন সহ নানা কর্মসূচি পালন করার কথা রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









