পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে ঘরে ঢুকে দাদিকে খুন ও পরে নাতনিকে অপহরণের পর ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মূলহোতা শরিফসহ জড়িতদের দ্রুত ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে এলাকাবাসী।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়কের কালিকাপুর বাজার এলাকায় এ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নিহতের স্বজন ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর রাস্তা অবরোধ করার কারণে যানজটের সৃষ্টি হলে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহত জামিলা আক্তারের বাবা মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘‘এক রাতে ওনারা আমার সব শেষ করে দিল। আমার জন্মদাত্রী মাকে ঘরেই খুন করল, আর আমার কলিজার টুকরা ছোট মেয়েটাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে ইজ্জত লুটে এভাবে মেরে ফেলল! বাবা হয়ে মেয়ের এই নৃশংস পরিণতি আমি কীভাবে সহ্য করব? আমি তো কোনোদিন কারও কোনো ক্ষতি করিনি, তাহলে আমার সাথে কেন এমন হলো? পুলিশ আসামি ধরেছে, প্রশাসন দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিচ্ছে সব বুঝলাম, কিন্তু আমার মা আর মেয়ে তো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। ঘাতক শরিফের যেন এমন শাস্তি হয়, যা দেখে আর কোনো বাবা যেন আমার মতো এভাবে বুকফাটা আর্তনাদ না করে। আমি আর কিচ্ছু চাই না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই আকুতি—আমার মা আর মেয়ের হত্যাকারীদের যেন দ্রুততম সময়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসি দেওয়া হয়।’’
নিহত জামিলা আক্তারের বড় বোন মোছা. জেরিন জাহান মিনু বলেন, ‘‘আমার নিষ্পাপ বোনটাকে ওরা এভাবে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে শেষ করে দিল! আমার দাদিকে ওরা ঘরেই খুন করল। আমরা কোনোদিন ভাবতেও পারিনি আমাদের নিজেদের বাড়িতেই এমন নৃশংস ঘটনা ঘটবে। আজ কতদিন হয়ে গেল আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারি না, শুধু বোনের ওই রাতের চিৎকার আর দাদির রক্তাক্ত মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পুলিশ নাকি আসামি ধরেছে, প্রশাসন বলছে দ্রুত বিচার হবে—কিন্তু আমাদের কোল তো খালিই হয়ে গেছে। আমাদের একটাই দাবি, ওই খুনি শরিফের যেন আর কোনোদিন জেল থেকে বের হওয়ার সুযোগ না হয়। ওকে যেন দ্রুত ফাঁসি দেওয়া হয়। আমার বোন আর দাদিকে যেভাবে মেরেছে, ওই নরপিশাচের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কলিজা শান্ত হবে না।’’
এলাকাবাসী জানায়, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুরো বাংলাদেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা নিজেদের ঘরেই এখন মা-বোনদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম আতঙ্কে আছি। এই মামলার বিচার যেন বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে। প্রশাসন আমাদের আশ্বাস দিয়েছে জুনের মধ্যে ডিএনএ রিপোর্ট দেবে এবং রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো দ্রুত বিচার হবে—আমরা তাদের এই কথার বাস্তবায়ন দেখতে চাই। আমাদের একটাই দাবি, মূলহোতা শরিফসহ এই নরপিশাচদের যেন প্রকাশ্য দিবালোকে দ্রুততম সময়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আর কোনো জামিলা যেন এভাবে অকালে ঝরে না যায়, প্রশাসনকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘‘আমাদের সবার উদ্দেশ্য একটাই অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি এবং দ্রুততম সময়ে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এখানে এসে সম্মানিত এলাকাবাসীর সাথে কথা বলেছি এবং তাদের ক্ষোভ ও দাবির সাথে আমরা একাত্ম। এই মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে আগামী জুন মাসের মধ্যেই ডিএনএ রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়া হবে, যাতে বিজ্ঞ আদালত দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রকৃত ন্যায়বিচার দিতে পারেন।’’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) প্রণব কুমার বলেন, দাদি-নাতনি হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনাটি পুরো বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত একটি ঘটনা। পুলিশ এই মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র গরিমসি বা অবহেলা করেনি, মূল অভিযুক্ত বর্তমানে জেল হেফাজতে রয়েছে। এই মামলার তদন্তে পুলিশের প্রায় সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ ইতোমধ্যে শেষ করেছি। এখন শুধুমাত্র ডিএনএ রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা রিপোর্টটি পেয়ে যাবো এবং তা পাওয়ার পরপরই বিজ্ঞ আদালতে পেশ করা হবে। অতীতে দেশজুড়ে আলোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার যেভাবে দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক একইভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজও দ্রুত শেষ হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









