গাজীপুরের কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কাপাসিয়া থানা ভবন। নদীর ধারাবাহিক ভাঙনে এখন থানার সীমানা প্রাচীরও নিরাপদ নয়। কয়েকদিনের টানা ও থেমে থেমে বৃষ্টির পর ভাঙনের গতি আরও বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। যে কোনো সময় থানার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে নদীভাঙন চললেও সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের পর পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে কাপাসিয়া থানার পেছনের অংশে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে থানার সীমানা ঘেঁষে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
শুধু থানা ভবনই নয়, ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে কাপাসিয়া বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, কাপাসিয়া থানা মসজিদ এবং এলাকার ঐতিহ্যবাহী জয়কালী মন্দির। প্রতিদিন নতুন নতুন ফাটল ও মাটি ধসের ঘটনায় এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চরম উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাঙন দেখা দিলেও এবারের পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। নদীর ডান তীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনার নিচের মাটি সরে যেতে শুরু করেছে। কয়েকটি স্থানে গভীর গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় পুরো এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দ্রুত তীর সংরক্ষণ, ব্লক স্থাপন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কাপাসিয়া বাজারের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম শাহীন বলেন, “নদীভাঙন এখন থানার পাকা ভবনের একেবারে কাছে চলে এসেছে। বৃষ্টির পর ভাঙনের গতি বেড়েছে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দেরি হলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।”
এদিকে, শীতলক্ষ্যা নদীর ডান তীরে ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমেদ।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, নদীর ইউ-টার্নের কারণে থানা সংলগ্ন এলাকায় তীব্র স্রোত তৈরি হয়েছে। এতে নদীর ডান তীর ঘেঁষে ভাঙন শুরু হয়ে থানার বিভিন্ন অংশে গভীর ফাটল ও মাটি ধসের ঘটনা ঘটছে। ইতোমধ্যে থানার সীমানা প্রাচীরে ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৫০ ফুট উচ্চতার বেতার টাওয়ার, থানা মসজিদ, পাকা ঘাটলা, অফিসার ব্যারাক, ওসির বাংলো এবং আনসার ব্যারাকসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এছাড়া পাশের একটি বেসরকারি মন্দির সংলগ্ন এলাকায়ও মাটি নদীতে ধসে পড়েছে।
ওসি আরও উল্লেখ করেন, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে থানার স্থাপনা ও আশপাশের সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তিনি দ্রুত ১৫০ মিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না তাসনীম ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাজীপুর কার্যালয়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রায়হান খান জানান, সংশ্লিষ্ট এলাকা ইতোমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। তবে যে ফাটলগুলো থানার সীমানার ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো আমাদের কাজের আওতায় পড়ে না। এ বিষয়ে থানা কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নদীর তীর সংরক্ষণের কাজের জন্য বর্তমানে কোনো বরাদ্দ নেই। পানি কমে গেলে আগামী অর্থবছরে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এদিকে, দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে আতঙ্ক। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ প্রশাসন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ এখন তাকিয়ে আছেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দিকে। তাদের আশঙ্কা, বিলম্ব হলে শীতলক্ষ্যার ভয়াল ভাঙনে কাপাসিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলো হারিয়ে যেতে পারে নদীর গর্ভে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









