‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর: বাস্তবতা, পরিচয় ও ভালোবাসার গোলকধাঁধা
ইতালীয় লেখক উমবের্তো একোর (১৯৩২–২০১৬) তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’। বইটিতে বাস্তবতার প্রকৃতি, মানুষের পরিচয় এবং ভাষা ও চিহ্নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে একো এক দীর্ঘ দার্শনিক অনুসন্ধান চালিয়েছেন। একো দেখতে চেয়েছেন, আমরা যাকে বাস্তবতা বলে মনে করি, তার অনেকটাই আসলে মানুষের তৈরি ধারণা। আর ভাষা, প্রতীক ও রূপক সব সময় আমাদের সত্যের কাছে পৌছে দেয় না; কখনো কখনো বরং বিভ্রান্ত করে।
উপন্যাসটি মূলত ১৭ শতকের এক অভিজাত যুবক রবার্তো দে লা গ্রিভার লেখা চিঠির আকারে নির্মিত। জাহাজডুবির পর রবার্তো একটি পরিত্যক্ত জাহাজে আটকা পড়ে। জাহাজটির নাম ‘ড্যাফনি’। রহস্যময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় একটি দ্বীপের কাছে নোঙর করা জাহাজটিতে কোনো মানুষ নেই।
রবার্তোর কাছে নিজের অবস্থান নির্ণয়ের কোনো উপায় নেই। বাড়ি ফেরার পথও জানা নেই। ফলে ধীরে ধীরে সে নিজেকে দর্শন ও কল্পনার জগতে ডুবিয়ে দেয়। খালি জাহাজের ভেতর ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে সে তার দূর থেকে ভালোবাসা নারী লিলিয়াকে চিঠি লিখতে থাকে।
উপন্যাসটি শুধু বর্তমানের এই নিঃসঙ্গ রবার্তোর গল্প নয়। তার লেখা ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকে তার অতীত জীবনের নানা ঘটনা।

কিশোর বয়সে রবার্তো ত্রিশ বছরের যুদ্ধের (ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় বিরোধ) সময় ক্যাসালের অবরোধ থেকে বেঁচে গিয়েছিল। সেই সময় থেকেই তার শৈশবের এক কল্পিত চরিত্র বাস্তব জীবনে ঢুকে পড়তে শুরু করে। এই চরিত্র তার সৎভাই ফেরান্তে।
ফেরান্তে যেন রবার্তোরই আরেক সংস্করণ। এক তরুণ সেনাপতির সঙ্গে রবার্তোর চেহারার আশ্চর্য মিল রয়েছে। অবরোধ শেষ করার জন্য সেই সেনাপতি একটি ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ে। তার কাজের শাস্তি প্রায় রবার্তোকেই পেতে হচ্ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ফেরান্তে রবার্তোর জীবন থেকে মুছে যায় না। প্যারিসে গিয়ে রবার্তো লিলিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়। কিন্তু সেখানেও তার মনে হয়, ফেরান্তে যেন তাকে অনুসরণ করে চলছে।
একসময় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে রবার্তো গ্রেপ্তার হয়। তার ধারণা হয়, এর পেছনেও ফেরান্তের হাত রয়েছে। রবার্তোর মনে হতে থাকে, তার জীবনের প্রতিটি বিপদ আসলে ফেরান্তের একটি পরিকল্পনা—তার জায়গা দখল করে পরিবারের উত্তরাধিকারী হওয়ার চেষ্টা।
গ্রেপ্তারের পর রবার্তোর সামনে মুক্তির একটি সুযোগ আসে। অশুভ চরিত্রের কার্ডিনাল মাজাঁরিন তাকে একটি গুপ্ত মিশনে পাঠান। তখন ইংরেজরা সমুদ্রে দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়ের একটি ‘স্থির বিন্দু’ খুঁজছিল। এই বিন্দু জানা গেলে নৌযাত্রার সময় নির্ভুলভাবে হিসাব করা সম্ভব হতো। রবার্তোর কাজ ছিল এই প্রচেষ্টার ওপর নজরদারি করা। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ তাকে নিয়ে যায় এক ভয়ংকর জাহাজডুবির দিকে। এরপর সে খুঁজে পায় ‘ড্যাফনি’ নামের সেই রহস্যময় জাহাজটিকে।
জাহাজটি যেন একটি ভূতুড়ে জগত। সেখানে অসংখ্য ঘড়ি, নানা ধরনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ, কিন্তু কোনো মানুষ নেই। জাহাজের আগের নাবিকেরাও সেই রহস্যময় ‘স্থির বিন্দু’ খুঁজছিল। রবার্তোর একাকিত্ব কিছুটা কমে আসে জার্মান যাজক ফাদার ক্যাসপার ওয়ান্ডারড্রসেলের উপস্থিতিতে। কিন্তু যাজকের সঙ্গে আলোচনা তার ধর্মীয় ও দার্শনিক বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। একসময় রবার্তোর পক্ষে বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
একোর আগের উপন্যাসগুলোর মতো এটিও অতীতের ফিরে গিয়ে বলা একটি গল্প। তবে এখানে বর্ণনাকারী আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন অজ্ঞাতনামা বর্ণনাকারী বারবার রবার্তোর বক্তব্যে হস্তক্ষেপ করেন। কখনো তার কথাকে ব্যঙ্গ করেন, কখনো তার যুক্তিকে নিয়ে ঠাট্টা করেন। ফলে গল্পটি শুধু রবার্তোর জীবনকাহিনি থাকে না; গল্পটি বলা এবং গল্প তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও একটি মজার খেলা হয়ে ওঠে।
রবার্তোর নিজের লেখাও তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। কারণ তার বর্ণনা বারবার বদলায়। সে যা দেখছে, তার অর্থ নিজের মতো করে তৈরি করছে।
গল্পের ঠিক এইখানে উমবের্তো একোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—প্রত্যেক মানুষ কি নিজের বাস্তবতার লেখক?
‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’–এর মধ্যে ‘রবিনসর ক্রসো’, ‘দ্য ম্যান ইন দ্য আয়রন মাস্ক’ এবং ‘গার্লিভার ট্রাভেলস’–এর মতো পরিচিত উপন্যাসের আবহ পাওয়া যায়।
একো এসব পরিচিত গল্পের উপাদানকে ১৭ শতকের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ধর্মীয় সংঘাত ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। ফলে তৈরি হয় এক বিশাল জ্ঞানভিত্তিক পৃক্ষাপটের কোলাজ।
এ কারণে বইটিকে একধরনের ‘চিন্তাশীল উপন্যাস’ও বলা যায়—যেখানে উপন্যাসের গল্পের পাশাপাশি ইতিহাস, দর্শন, ভাষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে আসে। নানান চিন্তার বিস্তার পরিলক্ষিত হয়।
রবার্তোর নিজের লেখার মধ্যেও একই কল্পনার খেলা দেখা যায়। ‘ড্যাফনি’ জাহাজে সে যা কিছু দেখে, তার অনেক কিছুকেই হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা লিলিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। ক্যাসাল ও প্যারিসের অতীতের ঘটনাগুলোও সে এমনভাবে বর্ণনা করে, যেন সেগুলোর কেন্দ্রেও লিলিয়া। অর্থাৎ লিলিয়া শুধু রবার্তোর ভালোবাসার মানুষ নন; ধীরে ধীরে সে রবার্তোর জীবনের অর্থ হয়ে ওঠে।
এখানেই রবার্তোর গল্পের একরৈখিকতা একই সঙ্গে হাস্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ। সে যা কিছু দেখে, যা কিছু মনে করে, শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে লিলিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে নেয়।
রবার্তো হয়তো বিভ্রান্ত। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তার বর্ণনা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু তার গল্প শুনতে আমাদের ভালো লাগে। এখানেই একোর বড় প্রশ্নটি ফিরে আসে—একটি গল্প বাস্তব কি না, সেটিই কি তার মূল্য নির্ধারণ করে?
রবার্তোর অসম্ভব প্রেমের গল্প বাস্তবতার দিক থেকে অবিশ্বাস্য হলেও সাহিত্য হিসেবে তা আনন্দদায়ক। অর্থাৎ সাহিত্যের আনন্দ সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে তার মিলের ওপর নির্ভর করে না।
এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে একোর ভাষার ব্যবহার। উপন্যাসজুড়ে আছে শব্দের খেলা, ধাঁধা, বুদ্ধিবৃত্তিক রসিকতা এবং নানা ধরনের ভাষাগত কৌতুক। ফলে বইটি কঠিন হলেও একোর রসবোধ তার জটিলতাকে অনেকটাই সহজ করে দেয়।
উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা হলো সময় ও স্থানকে আমরা যেভাবে বুঝি, সেগুলোও মানুষের তৈরি ধারণা। এগুলো সব সময় একইভাবে কাজ করে না এবং আমাদের বোঝার ক্ষমতাকেও বারবার চ্যালেঞ্জ করে। রবার্তো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দর্শন, ধর্ম, বিজ্ঞান ও ভাষার জটিল জগতে বারবার ঢুকে পড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকে লিলিয়ার প্রতি ভালোবাসা।
এই মহত্বই ‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’ উপন্যাসটির মানবিক দিকটিকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে রাখে।
রবার্তো যতই বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলুক, যতই দর্শনের গভীরে যাক, তার গল্পের মূল চালিকাশক্তি আসলে মানুষের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা। ভালোবাসাই তাকে পথ দেখায়।
‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’–এ একো একজন প্রকৃত সেমিওটিকসের গবেষকের মতন দেখিয়েছেন, আমাদের চারপাশের সংস্কৃতি আসলে অসংখ্য লেখা, চিহ্ন, ছবি ও গল্পের সমন্বয়ে তৈরি। মানুষ সেই জালের মধ্যেই নিজের পরিচয় ও বাস্তবতা তৈরি করে। রবার্তোও এর ব্যতিক্রম নয়। সে নিজের জীবনকে নিজের মতো করে লিখছে, ব্যাখ্যা করছে এবং পুনর্গঠন করছে। তাই উপন্যাসটি শুধু একজন জাহাজডুবি হওয়া মানুষের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে—বাস্তবতা কী? সত্য কী? আমরা নিজেদের সম্পর্কে যে গল্প বলি, সেটি কতটা বাস্তব? আর শেষ পর্যন্ত মানুষ কি নিজের জীবনের লেখক নিজে নয়?
একোর ‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফর’ জটিল, রসিক ও দার্শনিক উপন্যাসটির সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই—বাস্তবতা নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক, মানুষের ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও গল্প বলার প্রয়োজন শেষ পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশক হয়ে থাকে।

উমবের্তো একো: সত্য, কল্পকাহিনি ও হলি গ্রেইল
‘গল্পটি খুব সুন্দর ছিল। দুঃখের বিষয়, কেউ আর কখনো এ গল্পের কথা জানতে পারবে না।’
উমবের্তো একোর ‘বাউদোলিনো’ উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা এমনই। তবে উপন্যাসের অন্য জায়গায় প্রশ্ন ওঠে—‘আপনি নিশ্চয়ই মনে করেন না যে এই পৃথিবীতে গল্প বলার একমাত্র মানুষ আপনিই। একদিন না একদিন, বউদোলিনোর চেয়েও বড় কোনো মিথ্যুক এই গল্প বলবে।’
ইতালীয় লেখক, দার্শনিক ও সেমিওটিকসের গবেষক উমবের্তো একো গল্প বলতে ভালোবাসতেন। তার বিশ্বাস, গল্প বলার ইচ্ছা মানুষের সহজাত স্বভাবেরই অংশ। তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য নেইম অব দ্য রোজ’ বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এরপর ‘ফুকোস পেন্ডলাম’, ‘দ্য আইসল্যান্ড অফ দ্য ডে বিফ ‘–এর মতো উপন্যাসেও তিনি ইতিহাস, দর্শন, রহস্য ও কল্পনাকে একাকার করে দেখেছেন।
‘বাউদোলিনো’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বউদোলিনো—পবিত্র রোমান সম্রাট ফ্রেডেরিক বারবারোসার পালিত ছেলে। সে একই সঙ্গে অসাধারণ গল্প বলতে পারে এবং ভয়ংকর মিথ্যাবাদী। নানা ভাষা শুনলেই দ্রুত শিখে ফেলার ক্ষমতাও তার আছে। ক্রুসেডাররা যখন কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করছে, তখন সে রাজদরবারের ইতিহাসবিদ নিকেতাসকে উদ্ধার করে। এরপর শুরু হয় তার জীবনের গল্প বলা।
পবিত্র গ্রেইল, টুরিনের কাফন, প্রেস্টার জনের রাজ্য, ক্রুসেড, মধ্যযুগের নানা কিংবদন্তি—সব মিলিয়ে ‘বাউদোলিনো’ একদিকে রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক উপন্যাস, অন্যদিকে সত্য, মিথ্যা ও গল্প বলার শক্তি নিয়ে গভীর চিন্তাশীল লেখা।
শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক লেখক ও সম্পাদক জেসিকা জার্নিগানের নেওয়া এ সাক্ষাৎকারটি একোর মৃত্যুর দুইদিন পর ‘মিডিয়া’ নামক একটি দর্শন-শিল্প সাহিত্যের পোর্টালে প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারে উমবের্তো একো কথা বলেছেন গল্প, সত্য, অনুবাদ, ভাষা ও মানুষের কল্পনাশক্তি নিয়ে।
প্রশ্ন: উপন্যাসের শেষে কি ধরে নিতে হবে যে আপনি বউদোলিনোর চেয়েও বড় মিথ্যুক?
উমবের্তো একো: হা হা! পুরো বইটিই আসলে এই প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—বউদোলিনো সত্য বলছে, নাকি মিথ্যা?নিকেতাসও বুঝতে পারে না বউদোলিনো সত্যি কথা বলছে কি না। লেখক নিজে যখন গল্প বলেন, সেই কয়েকটি মুহূর্ত বাদ দিলে পুরো উপন্যাসই আসলে বউদোলিনোর বলা গল্প।
এখানে মূল বিষয় হলো দ্ব্যর্থতা। বউদোলিনোর গল্পগুলো প্রথমে তার নিজের বানানো। কিন্তু একসময় সেগুলোই সত্যি হয়ে ওঠে। আমি আসলে গল্প বলার মানুষের অসাধারণ ক্ষমতাকে উদ্যাপন করতে চেয়েছি। একজন গল্পকার এমন কিছু বলেন, যা বলার আগে পৃথিবীতে ছিল না। গল্প বলার মাধ্যমে তিনি সেটিকে অস্তিত্ব দেন।
এটি যেমন লেখকের উদ্যাপন, তেমনি পাঠকেরও উদ্যাপন।
প্রশ্ন: আপনার উপন্যাসের সঙ্গে আপনার একাডেমিক কাজের সম্পর্ক কী?
উমবের্তো একো: গল্প বলতে আমার খুব ভালো লাগে। তাই বলা যায়, উপন্যাস লেখা আমার গবেষণার কাজ থেকে একধরনের অবসর নেওয়া। তবে মজার ব্যাপার হলো, গবেষণামূলক বই লেখার সময়ও আমি গল্প বলার আনন্দ পাই। কারণ একটি গবেষণামূলক বইও আসলে গবেষণার গল্প।
আমার মনে হয়, দর্শনের প্রতিটি বড় বইয়ের মধ্যেও একটি বুদ্ধিবৃত্তিক গল্প থাকে। সেখানে আপনি শুধু জানতে চান না—‘খুনি কে?’ বরং প্রশ্ন করেন, ‘এই ধারণাটি কে তৈরি করল? এই চিন্তা কোথা থেকে এল? এর কারণ কি?’
তাই গবেষণামূলক লেখার মধ্যেও একটি গল্প থাকে।
প্রশ্ন: সেমিওটিকস বা চিহ্নতত্ত্ব খুব সহজ করে কীভাবে বোঝাবেন?
উমবের্তো একো: সাধারণভাবে বললে, মানুষ হলো যোগাযোগকারী প্রাণী। আমরা শুধু শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করি না। ছবি, অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের নড়াচড়া—এসব দিয়েও আমরা অনেক কিছু বোঝাই। মানুষের জীবনও নানা ধরনের চিহ্নে ভরা। আপনি যখন কোনো একটি বিষয় বোঝানোর জন্য কিছু তৈরি করেন, সেটি একটি চিহ্ন।
সেমিওটিকস এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে ভাবতে চায়। এর লক্ষ্য হলো—এই সব চিহ্ন ও যোগাযোগের মধ্যে কোনো সাধারণ ভিত্তি আছে কি না, তা বোঝা। এক অর্থে, সেমিওটিকস মানুষের সবচেয়ে মানবিক দিকটি বোঝার চেষ্টা করে।
প্রশ্ন: ‘দ্য আইসল্যান্ড অব দ্য ডে বিফর’ প্রকাশের সময় একজন সমালোচক বলেছিলেন, বইটিতে শুধু হলি গ্রেইল ও টুরিনের কাফনের উল্লেখ নেই। ‘বাউদোলিনো’–তে কি আপনি ইচ্ছা করেই সেই ‘ঘাটতি’ পূরণ করেছেন?
উমবের্তো একো: হা হা! হলি গ্রেইল তো সব জায়গাতেই হাজির হয়। আসলে হলি গ্রেইল এমন কিছুর প্রতীক, যা আমরা খুঁজে চলেছি, কিন্তু কখনো পুরোপুরি খুঁজে পাই না। সেই অর্থে ‘দ্য আইসল্যান্ড অব দ্য ডে বিফর’–এও একটি হলি গ্রেইল ছিল। সেটি ছিল এমন একটি দ্বীপ, যেখানে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। কিংবা সেই নারী, যে হারিয়ে গিয়েছিল।

হলি গ্রেইল আসলে অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার রূপক বা চিহ্ন।
তবে ‘বাউদোলিনো’–তে আমাকে সত্যিকারের গ্রেইল আনতেই হয়েছিল। কারণ বউদোলিনো ঠিক সেই সময়ে বাস করছিল, যখন গ্রেইল নিয়ে প্রথম গল্পগুলো লেখা হচ্ছিল। খুব মনোযোগী ও একাডেমিক জ্ঞানসম্পন্ন পাঠকরা হয়তো খেয়াল করেছেন, বউদোলিনোর দুই বন্ধুর নাম বোরন ও কিয়োত।
রবার্ট দ্য বোরন হলি গ্রেইল নিয়ে প্রথম দিককার গল্পগুলোর একজন লেখক ছিলেন। আর কিয়োত নাকি ভলফ্রাম ফন এসেনবাখকে ‘পার্জিভাল’লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যে বইয়ে গ্রেইলের গল্প আছে।
তাই আবারও বলা যায়, বউদোলিনো সবকিছু বানিয়ে নিয়েছিল। সে তার দুই বন্ধুকে বলেছিল, তারা যেন নিজেদের গল্প নিয়ে ফিরে যায়। ওই দুজনকে তো কোথাও না কোথাও থাকতে হতো। তাই আমি তাদের বউদোলিনোর জগতে থাকতে দিলাম। এতে তো কোনো নিষেধ নেই!
প্রশ্ন: আপনার উপন্যাসে এমন কোনো গোপন ইঙ্গিত বা উদ্ধৃতি আছে, যা আপনি মনে করেন কোনো পাঠকই কখনো খুঁজে পাবেন না?
উমবের্তো একো: অবশ্যই আছে। আমার উপন্যাসগুলো গোপন জিনিসে ভর্তি। বেশির ভাগ গোপন কথাই শুধু আমি জানি। হা হা! অতীতের অনেক বড় চিত্রশিল্পী যখন বিশাল কোনো জনসমাবেশ আঁকতেন, তখন ভিড়ের মধ্যে নিজেদের মুখ কিংবা বন্ধুবান্ধবের মুখও এঁকে দিতেন। কখনো আমরা সেই মুখগুলো খুঁজে বের করতে পেরেছি, কখনো পারিনি।
কিন্তু সেই গোপন বিষয়টি আমরা না চিনলেও ছবিটির সৌন্দর্য বা মূল্য কমে যায় না। আমার উপন্যাসের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই।
প্রশ্ন: নিকেতাস যখন বউদোলিনোর অসংখ্য ভাষা বলার ক্ষমতা আবিষ্কার করে, তখন তার মনে হয়—যে মানুষ এতগুলো কণ্ঠে কথা বলতে পারে, তার হয়তো কোনো আত্মাই নেই। আপনার উপন্যাস যখন ইতালীয় ভাষার বদলে অনুবাদে সারা পৃথিবীর মানুষ পড়ে, তখন কি আপনার উদ্বেগ হয়?
উমবের্তো একো: আমি এখন অনুবাদ নিয়ে একটি বই শেষ করছি। সেখানে মূলত আমার অনুবাদকদের সঙ্গে কাজ করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা লিখেছি। আপনি যদি কোনো বিদেশি ভাষা জানেন, তাহলে অনুবাদকের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে পারেন। আমি ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশ জানি, আর সামান্য জার্মানও জানি।
কিন্তু অনুবাদকের ভাষা আপনি না জানলেও, তিনি যদি বুদ্ধিমান ও অসাধারণ দক্ষ হন, তাহলেও তার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব। তার নিজের ভাষার প্রতি যদি গভীর অনুভূতি থাকে, তাহলে তার সঙ্গে আলোচনা করে অনুবাদের সমস্যার সমাধান বের করা যায়।
আমার সব অনুবাদের ক্ষেত্রে অবশ্য এমনটা হয়নি। আরবি বা এস্তোনীয় ভাষায় আমার বইয়ের অনুবাদ নিয়ে আমি হয়তো এভাবে কাজ করতে পারিনি। তবে অনেক অনুবাদকের সঙ্গে আমি সরাসরি কাজ করেছি। তাই অনেক সময় আমার মনে হয়েছে, অনুবাদটিও যেন আমার নিজের কাজ।
আমি এ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী।
প্রশ্ন: বউদোলিনো সব ভাষা বলতে পারে। এটা কি আপনার নিজের স্বপ্ন?
উমবের্তো একো: এটা শুধু আমার স্বপ্ন নয়, মানবজাতির স্বপ্ন। বাবেল টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার পর মানুষের ভাষাগুলো আলাদা হয়ে গেল, নানা ভাষার জন্ম হলো। তারপর থেকেই মানুষ একটি আদি বা অভিন্ন ভাষা খুঁজে চলেছে।
তাই বউদোলিনো হলো মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতীক—সব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারার আদর্শ।
তবে এর মধ্যে আমার নিজের একটা কৌশলও ছিল। বউদোলিনো পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। আমি তো উপন্যাসে প্রতিটি মানুষকে আলাদা ভাষায় কথা বলাতে পারতাম না। সেটা অসম্ভব হতো। সিনেমার মতো সাবটাইটেল দিতে হতো!

তাই বউদোলিনোকে দ্রুত সব ভাষা শিখে ফেলার ক্ষমতা দিতে হয়েছে।
প্রশ্ন: যদি স্বর্গে মানুষের জন্য একটি মাত্র ভাষা থাকত, তাহলে কি উপন্যাস বা গল্পের প্রয়োজন থাকত? নাকি কল্পকাহিনি আমাদের অসম্পূর্ণ পৃথিবীর ফল?
উমবের্তো একো: যদি পৃথিবীর সব মানুষের জন্য মাত্র একটি ভাষা থাকত, তাহলে আমরা এত গল্প পেতাম না। প্রতিটি সংস্কৃতি, প্রতিটি সভ্যতা এবং প্রতিটি ভাষা পৃথিবীকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ দেয়। আর সেই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই জন্ম নেয় ভিন্ন ভিন্ন গল্প।
অনেক ভাষা থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধাই হলো—আমরা অনেক ধরনের গল্প পাই। একটি মাত্র ভাষা হয়তো আমাদের একে অন্যকে আরও সহজে বুঝতে সাহায্য করত। কিন্তু পৃথিবীকে দেখার এত বৈচিত্র্যময় উপায় হয়তো তখন থাকত না।
আর মানুষের কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্যই তো গল্পকে এত সমৃদ্ধ করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









