চুলা থেকে ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু সেখানে আজ কোনো আনন্দের রান্না হচ্ছে না। চোখের জল আর কাঠের আগুন মিলেমিশে একাকার চকরথিনাথ গ্রামের এক গৃহবধূর উঠোনে। কারণ, এই ভিটেয় এটাই তাঁর শেষ রান্না। পরদিনই হয়তো এই রান্নাঘরটি থাকবে না, থাকবে না এই সাজানো উঠোন। গ্রাস করে নেবে রাক্ষুসে যমুনা।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নে এখন কোনো উৎসব নেই, আছে শুধু ঘর ভাঙার শব্দ। গত এক সপ্তাহে যমুনার করাল গ্রাসে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ১৯৫টি পরিবারের বসতভিটা।
নদী ভাঙলে মানুষ সচরাচর পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিকে তাকায়। কিন্তু হাটশেরপুরবাসীর জন্য পাউবোর উত্তরটা নির্মম। সরকারের খাতায় এই গ্রামগুলো ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের বাইরে’ অবস্থিত। আমলাতান্ত্রিক এই এক লাইনের সমীকরণের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য।
পাউবো বলছে, বাঁধের বাইরে হওয়ায় বারবার প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েও ঢাকা থেকে বরাদ্দ মিলছে না।
প্রশ্ন উঠেছে, বাঁধের বাইরে যারা বাস করেন, তারা কি এই দেশের নাগরিক নন? প্রতিবছর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই কান্নার খবর ছাপা হলেও গত এক দশকে কেন এখানে একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ করা গেল না— এই ক্ষোভ এখন এলাকার বাতাসে ভারি করে রেখেছে।
২০১৫ সাল থেকে শুরু করে গত কয়েক বছরে হাটশেরপুর ও চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার পরিবার যমুনার পেটে চলে গেছে। চকরতিনাথ গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল জলিল শেখের জীবনটাই যেন নদী ভাঙার এক জীবন্ত ইতিহাস। চারবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সাত বছর আগে হাটশেরপুরে এসে নতুন সংসার পেতেছিলেন। আলো জ্বলেছিল ঘরে, উঠোনে বড় হয়েছিল গাছপালা।
আব্দুল জলিল শেখ শূন্য চোখে চেয়ে বলেন,“যমুনা আমার ঘর কাড়ল, আলো কাড়ল, শেষ বয়সের শান্তিটুকুও কাড়ল। সরকার কত জায়গায় কাজ করে, আমাদের বেলায় কেন এই অবহেলা? এখন আবার ওই ধুধু বালুচরে গিয়ে নতুন করে লড়াই শুরু করতে হবে।”
দশ দিনের তীব্র ভাঙনে ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এলাকার একমাত্র শিক্ষার আলো ছড়ানো ‘চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি’ যখন যমুনার পেটে যাচ্ছিল, তখন গ্রামের মানুষ শেষ চেষ্টা হিসেবে স্কুলটি রক্ষা করতে পারেনি। বর্তমানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ক্রসবাঁধের ওপর খোলা আকাশের নিচে কোনো রকমে চলছে শিশুদের পাঠদান। ঘর হারা শিশুরা এখন স্কুল হারিয়েও দিশেহারা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও ৪টি স্কুল, বেশ কিছু মসজিদ ও ৩০০ পরিবার উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাটশেরপুর ইউপি চেয়ারম্যান নূর মোঃ মেহেদী হাসান আলো প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছেন, আর সেই তালিকা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস জানিয়েছেন, তিনি এলাকা পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক ও মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।
অন্যদিকে, বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কাজী রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ‘ডিও লেটার’ পাঠানো হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব চিঠিপত্র আর আশ্বাসের বাণী যমুনার প্রবল স্রোতকে থামাতে পারছে না। নদী পাড়ের মানুষের দাবি, ত্রাণ নয়, তারা স্থায়ী বাঁধ চান। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেছনে ফেলে অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে নদী শাসন করা না হলে, অচিরেই সারিয়াকান্দির এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি চিরতরে নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









