বরিশালে একটি বেসরকারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে নিজ কার্যালয়ে আটকে রেখে মারধর, শারীরিক নির্যাতন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে স্ট্যাম্প ও চেকে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
রবিবার (৫ জুলাই) সকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি একটি অফিসকক্ষে প্রবেশ করে এক ব্যবসায়ীকে মারধর করছেন। একপর্যায়ে তাকে বিভিন্ন কাগজপত্র ও চেকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে নানা মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওটি আদালতে উপস্থাপনের পর মামলা রুজুর নির্দেশ দেন আদালত। এরপর অভিযান চালিয়ে দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার মো. আব্দুল আজিজ হাওলাদার বাকলা ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান এবং অগ্রণী হাউজিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)।
আব্দুল আজিজ হাওলাদার অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু, আবুল কালাম আজাদ ও আব্দুল মালেক দূরানী তার দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং একসময় ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও আবুল কালাম আজাদ বাকলা ডেভেলপারস প্রাইভেট লিমিটেড-এর শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। ২০২৩ সালে তারা নিজেদের সব শেয়ার বিক্রি করে দেনাপাওনার হিসাবও চূড়ান্ত করেন। এছাড়া লিটু ও মালেক অগ্রণী হাউজিং কোম্পানির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, ২৭ জুন রাতে অভিযুক্তরা বাকলা ডেভেলপারসের কার্যালয়ে এসে প্রথমে পূর্বের আর্থিক লেনদেনের বিষয় তুলে ধরে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে তাকে মারধর করেন। এরপর ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে কয়েকটি ব্ল্যাঙ্ক চেক, লিখিত চেক এবং ছয়টি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেন।
তিনি আরো দাবি করেন, ঘটনার পর অভিযুক্তরা উল্টো তার বিরুদ্ধে টাকা পাওয়ার অভিযোগ তুলে থানায় আবেদন করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সালিশেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে মারধরের কারণে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে মামলা দায়ের করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আবদুল রশীদ খান বলেন, আমার মক্কেলকে নির্মমভাবে মারধর করে একটি লিখিত চেক, কয়েকটি ব্ল্যাঙ্ক চেক এবং ছয়টি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। ঘটনার ভিডিও আদালতে উপস্থাপন করার পর আদালত মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু দাবি করেন, দীর্ঘদিনের পাওনা অর্থ না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত।
মোস্তাফিজুর রহমান লিটু আরো দাবি করেন, মো. আব্দুল আজিজ হাওলাদার আমাদের পাওনা টাকা পরিশোধ না করে আটকে রেখেছেন। এতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছি। সেই ক্ষোভ থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন পোস্টে মোস্তাফিজুর রহমান লিটুকে যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে বরিশাল মহানগর ও জেলা যুবদল। সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট এইচ এম তসলিম উদ্দিন বলেন, মোস্তাফিজুর রহমান লিটুর সঙ্গে যুবদলের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। তিনি কখনও দলের কোনো কমিটির সদস্য ছিলেন না। এমনকি দলের কোনো সভা-সমাবেশ বা মিছিলেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য নেই।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলা রুজুর পরপরই পুলিশ অভিযান শুরু করে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও আবুল কালাম আজাদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে ঘটনায় জড়িত অন্যদের ভূমিকাও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং সবার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









