এক দশক আগে শুরু হয়েছিল শরীয়তপুরের নড়িয়া-জাজিরা-ঢাকা সড়কের কীর্তিনাশা নদীর ওপর ভাষাসৈনিক গোলাম মাওলা সেতুর নির্মাণকাজ। লক্ষ্য ছিল দুই উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের যাতায়াত দুর্ভোগ দূর করা। কিন্তু ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সেতু আজও চালু হয়নি। বরং বারবার ঠিকাদার পরিবর্তন, কাজ বন্ধ থাকা এবং দীর্ঘসূত্রতায় ১৪ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ কোটিতে। অন্যদিকে পুরোনো সেতু ভেঙে ফেলার পর গত তিন বছর ধরে হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলার ও নৌকায় নদী পার হতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, নড়িয়া উপজেলার কীর্তিনাশা নদীর ওপর ২০১৭ সালে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪৫ মিটার দীর্ঘ নতুন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রথম দফায় কাজের দায়িত্ব পায় নাভানা কনস্ট্রাকশন। কিছুদিন কাজ করার পর প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় এবং ২০১৯ সালে প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।
পরে ২০২১ সালে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে কোহিনুর এন্টারপ্রাইজকে ২৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় সেতু ও ২২২ মিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে থেমে যায়। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং আরও ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া চলছে।
বর্তমানে অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে তৃতীয় দফায় নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে নতুন ঠিকাদারকে এক বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ২ লাখ টাকা, যা প্রাথমিক ব্যয়ের প্রায় তিন গুণ।
এলজিইডি সূত্র জানায়, কীর্তিনাশা নদীর পূর্ব তীরে নড়িয়া উপজেলা সদর এবং পশ্চিম তীরে মোক্তারের চর, রাজনগর, নশাসন ও জপসা ইউনিয়ন অবস্থিত। এছাড়া জাজিরা উপজেলার একাধিক ইউনিয়নের মানুষেরও উপজেলা সদরে যাতায়াতের অন্যতম পথ এটি। ১৯৯৭ সালে নির্মিত পুরোনো ১০৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় ২০১৫ সালে ভারী যান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলে ২০২৩ সালে পুরোনো সেতুটি ভেঙে ফেলা হয়।
এরপর থেকেই শুরু হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। বর্তমানে তিনটি ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী ও মোটরসাইকেল পারাপার করা হচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন। নড়িয়া সরকারি কলেজ, বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক এবং চিকিৎসাসেবাপ্রার্থীরা প্রতিদিন এই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে ট্রলারে পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েকটি দুর্ঘটনায় যাত্রী আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারেন না। অনেকে ঝুঁকি এড়াতে বাধ্য হয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে পদ্মা সেতু ব্যবহার করেন। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় জনগণ যেমন দুর্ভোগে পড়েছে, তেমনি সরকারের ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বারবার ঠিকাদার পরিবর্তনের দায় কার, সেই প্রশ্নও তুলছেন তারা। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে এলজিইডি শরীয়তপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম বলেন, "প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং আর্থিক জরিমানার প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে নতুন ঠিকাদারকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
দীর্ঘ ১০ বছরের অপেক্ষার পরও সেতুটি চালু না হওয়ায় ক্ষোভ বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আর কোনো বিলম্ব নয়—নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ করে জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









