টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদের বাঁধ এবং হবিগঞ্জের খোয়াই ও কুশিয়ারার বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। প্লাবিত এলাকাগুলোতে সড়ক ও কালভার্ট ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় এখনও সরকারি সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে সময় যত যাচ্ছে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। দুই জেলার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে।
মৌলভীবাজারে পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ
মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে জেলা সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। জেলা সদরের ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার মানুষ ঠাঁই নিয়েছেন।
বন্যাকবলিত এলাকাবাসী জানান, জেলায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি থাকলেও অল্পসংখ্যক পরিবার ত্রাণ পেয়েছে। মূলত যাদের বাড়ি রাস্তার পাশে তাদেরই ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। যেসব জায়গায় গাড়ি যায়নি সেসব এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি। এতে বন্যার্তদের মাঝে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুর রহমান ও হাওয়া বেগম জানান, ৩ দিন ধরে তাদের ঘরে হাঁটুসমান পানি। এখন পর্যন্ত তারা কোনো সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ পাননি।
জেলা প্রশাসক সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৫টি উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৯০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, “মনু নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে। একটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর পানি থাকলেও অন্যান্য জায়গায় তা নেমে এসেছে। আশা করি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে যাবে।”
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, “বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। শুকনো খাবারের পাশাপাশি চাল ও টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পানি কমায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে।”
খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমেছে
হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কালীগঞ্জ এলাকায় ভাঙনের কারণে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল। বর্তমানে ৩টি উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৬ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রেগুলোতে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুসারে, খোয়াই নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়ক পানিতে তলিয়ে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জগন্নাথপুরে ঢলে তলিয়ে গেছে আউশ ও আমন
কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও, রানীগঞ্জ ও আশারকান্দি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। রানীগঞ্জ ইউনিয়নের বালিশ্রী-রৌয়াইল গ্রামের একমাত্র পাকা সড়কটি ভেঙে প্রবল স্রোতে পানি প্রবেশ করায় ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বিকল্প সড়ক না থাকায় স্থানীয়রা নৌকা দিয়ে যাতায়াত করছেন।
বন্যার পানিতে আউশ ধান এবং আমন ধানের বীজতলা ও চারা তলিয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। রানীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ছদরুল ইসলাম জানান, সড়কটি স্থায়ীভাবে মেরামতের জন্য এলজিইডি ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
সিলেটে নদ-নদীর পানি কমছে
সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি কমছে। পানি কমছে সারিগোয়াইন, পিয়াইন, লোভাছড়া ও ধলা নদীর।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) দীপক রঞ্জন দাশ দুপুরে এদিনকে জানান, সিলেটের সবকটি নদ-নদীর পানি দ্রুতই হ্রাস পাচ্ছে। তবে ঢল এখনও অব্যাহত আছে। ফলে যেকোনো সময় নদনদীতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে বন্যার শঙ্কা আপাতত নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









