বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন সড়কে শুরু হয় ভাঙন, গর্ত এবং জলাবদ্ধতার দীর্ঘ চিত্র। কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টিতে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক, ইউনিয়ন সড়ক, গ্রামীণ সংযোগপথ এবং বাজারকেন্দ্রিক সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, আবার অনেক স্থানে সড়কের পাশ ধসে পড়ায় যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ যাত্রীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর একই ধরনের সমস্যা দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ফলে বর্ষা এলেই নতুন করে দুর্ভোগ শুরু হয়।
সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়কগুলোতে অতিবৃষ্টির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। অনেক এলাকায় বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকায় সড়কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ভারী যানবাহন চলাচলের চাপ সহ্য করতে না পেরে বিভিন্ন স্থানে সড়ক দেবে গেছে। কোথাও কোথাও পিচের স্তর উঠে গিয়ে ইট ও খোয়া বের হয়ে এসেছে। এতে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, সিএনজি এবং ছোট যানবাহনের চালকদের প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও বাড়ছে ঝুঁকি
উপজেলার বিভিন্ন বাজারসংলগ্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথ এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের সংযোগ সড়কগুলোতে বৃষ্টির কারণে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জায়গায় গর্তগুলো বৃষ্টির পানিতে ঢেকে থাকায় চালকেরা আগে থেকে বুঝতে পারেন না। ফলে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় অফিসগামী মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের চলাচলে চরম ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানবাহনও অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বর্ষা শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলো মেরামত করা হলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকায় বৃষ্টির পানিতে সেগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে।
ব্যবসা ও অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব
সড়কের বেহাল অবস্থার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। বাজারে কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগছে। অনেক পরিবহনচালক ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক এড়িয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তারাও পরোক্ষভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, গ্রামের উৎপাদিত সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারায় অনেক সময় ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। আবার বৃষ্টির দিনে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে কৃষকের লোকসান বাড়ছে।
শিক্ষার্থী ও রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে
অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী ও রোগীদের ওপর। বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াতের সময় শিক্ষার্থীদের কাদা, পানি ও ভাঙা সড়ক পেরিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার কারণে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
অন্যদিকে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা চট্টগ্রামমুখী রোগীবাহী যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে ধীরগতিতে চলায় জরুরি চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, সড়কের এমন অবস্থা শুধু দুর্ভোগই নয়, অনেক সময় জীবনঝুঁকিও তৈরি করছে।
ড্রেনেজ সংকট বাড়াচ্ছে সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিবৃষ্টির পাশাপাশি অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাও সড়ক ক্ষতির অন্যতম কারণ। অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় দিনের পর দিন সড়কের ওপর পানি জমে থাকে। এতে সড়কের নির্মাণসামগ্রী দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অল্প সময়েই পিচ উঠে যায়। কোথাও কোথাও ড্রেন ভরাট কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণের সময় মানসম্মত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় প্রতিবছর একই সমস্যা ফিরে আসে। ফলে সংস্কারের জন্য বারবার সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা স্থায়ী সমাধানের
সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশে শুধু সাময়িকভাবে খোয়া বা ইট ফেলে সংস্কার করলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল পাওয়া যায় না। বরং বর্ষা মৌসুমের আগে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে টেকসই সংস্কার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা হলে সড়কের আয়ু অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।
এলাকাবাসীর মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি কাজের গুণগত মান কঠোরভাবে তদারকি করা জরুরি। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা তদারকির ঘাটতি থাকলে নতুন সড়কও অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংস্কার কার্যক্রমে গতি আনার দাবি
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো চিহ্নিত করে জরুরি সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বর্ষাকালে সাময়িক মেরামতের পাশাপাশি বর্ষা শেষে স্থায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং সড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করা হলে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে।
সড়ক যোগাযোগ একটি এলাকার অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সার্বিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। তাই সীতাকুণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আর দুর্ভোগের বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। উন্নয়নশীল শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ডের জন্য নিরাপদ, টেকসই ও মানসম্মত সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করা শুধু জনদুর্ভোগ কমানোর বিষয় নয়, বরং এলাকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ধরে রাখারও গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









