চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার থেকে যাত্রা শুরু করা একটি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ আজ বাংলাদেশের উন্নয়ন অঙ্গনে একটি সুপরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। সেই প্রতিষ্ঠানটি হলো 'ওয়াইপিএসএ' (Young Power in Social Action (YPSA)। ১৯৮৫ সালে আন্তর্জাতিক যুববর্ষ উপলক্ষে একদল তরুণের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যুব উন্নয়ন এবং টেকসই সামাজিক উন্নয়নের বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে কাজ করে আসছে।
এই দীর্ঘ পথচলার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রয়েছেন ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। তার দূরদর্শী চিন্তাভাবনা, গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্ব ‘ওয়াইপিএসএ’-কে একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ থেকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত করেছে।
ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সীতাকুণ্ডের মহাদেবপুরে। শৈশব থেকেই তিনি সমাজের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আগ্রহী ছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, তরুণদের সংগঠিত ও সক্ষম করে তুলতে পারলে সমাজে টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই তিনি একদল তরুণকে সঙ্গে নিয়ে ‘ওয়াইপিএসএ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। শুরুতে এটি ছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফর্ম, যা ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়।
ড. আরিফুর রহমান রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও গভর্ন্যান্স বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র ছিল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে উন্নয়ন সংস্থার ভূমিকা। এই গবেষণানির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি YPSA-এর কর্মপরিকল্পনাকে বাস্তবমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাঁর অবদান স্বীকৃত হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের Department of State-এর Legislative Fellowship এবং Eisenhower Fellowship-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। এসব অভিজ্ঞতা ‘ওয়াইপিএসএ’-এর কর্মকাণ্ডকে বৈশ্বিক উন্নয়ন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
‘ওয়াইপিএসএ’-এর মূল দর্শন হলো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভরশীল সমাজ গঠন। সংস্থাটি বিশ্বাস করে, শুধু সহায়তা প্রদান নয় বরং শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান টেকসইভাবে উন্নত করা সম্ভব।
শিক্ষা খাতে ‘ওয়াইপিএসএ’ দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় মূলধারায় ফিরিয়ে আনা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানমুখী প্রস্তুতি তৈরিতে সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্বাস্থ্য খাতেও সংস্থাটি কাজ করছে। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পুষ্টি এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখা হচ্ছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ‘ওয়াইপিএসএ’-এর অন্যতম অগ্রাধিকার। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটির মাধ্যমে তাদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ‘ওয়াইপিএসএ’ বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সচেতনতা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে কাজ করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সংস্থাটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও ‘ওয়াইপিএসএ’ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে জরুরি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
যুব উন্নয়ন ‘ওয়াইপিএসএ’-এর মূল ভিত্তি। নেতৃত্ব বিকাশ, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের সমাজ পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবন ‘ওয়াইপিএসএ’-এর কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করেছে। সামাজিক সমস্যার তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরিতে গবেষণার ব্যবহার প্রতিষ্ঠানটিকে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত করেছে।
ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে ‘ওয়াইপিএসএ’ স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে সংস্থাটি কাজ করছে।
নারী ও শিশুর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ‘ওয়াইপিএসএ’ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড. মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং মানবকল্যাণে দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার ‘ওয়াইপিএসএ’-এর সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। তার নেতৃত্বে একটি স্থানীয় উদ্যোগ আজ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অঙ্গনে একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও YPSA শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রতিবন্ধী অধিকার, যুব উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সীতাকুণ্ড থেকে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ইতিবাচক উন্নয়ন ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









