পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামের ১০ বছর বয়সী শিশু কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজের সাত দিন পর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী আসামিদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালালে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় মোস্তফা কামাল (৫৫) ও ইয়াছিন আলী (২১) নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মামলার তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কামাল প্রামাণিকের মেয়ে কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে পাবনা সদর থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ সাত দিন খোঁজাখুঁজির পর বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, মরদেহ উদ্ধারের সময় বস্তার ভেতর থেকে লাশ ডুবিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত ইটসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মোস্তফা কামাল ও ইয়াছিন আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অভিযুক্তরা শিশুটিকে প্রলোভন দেখিয়ে একটি কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে প্রথমে ঘরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন রাতে বস্তাবন্দি মরদেহ একটি ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, স্থানীয়দের তৎপরতা এবং বাড়ি বাড়ি তল্লাশির ঘোষণার পর অভিযুক্তরা মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে তারা মরদেহ ফেলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেখান থেকেই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত মোস্তফা কামালের ব্যবহৃত মোবাইলফোন পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত পাওয়া গেছে। নিখোঁজ হওয়ার দিন শিশুটির কয়েকটি ছবি ধারণ করা হয়েছিল, যা পরে মুছে ফেলা হলেও প্রযুক্তিগত সহায়তায় পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এসব আলামত ঘটনার পূর্বপ্রস্তুতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মামলাটির তদন্তভার পাবনা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গ্রেপ্তার দুই আসামির বাড়িতে ভাঙচুর চালায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্র ও স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গ্রামবাসীর দাবি, শিশু কলি হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় অন্যকেউ জড়িত থাকলে তাদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তারা।
পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ বলেন, “শিশু কলি হত্যা মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “তদন্তে পাওয়া আলামত, ডিজিটাল তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দ্রুততম সময়ে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন এবং বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে।”
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শিশু কলির মৃত্যুতে কুলুনিয়াসহ আশপাশের এলাকায় এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









