মাঠজুড়ে পাকা ফসলের সোনাঝরা হাসি। কোথাও টমেটোর লাল আভা, কোথাও ফুলকপি-বাঁধাকপির সবুজ সমারোহ। কৃষকের ঘাম আর শ্রমে ভরে উঠেছে ক্ষেত। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তোলার আনন্দ যেন ম্লান হয়ে গেছে সংরক্ষণের অভাবে। ফসলের দিকে তাকিয়ে কৃষকের চোখে এখন স্বপ্নের বদলে আতঙ্ক—কখন পচে যাবে, কখন কম দামে বিক্রি করে দিতে হবে, সেই দুশ্চিন্তাই যেন তাদের নিত্যসঙ্গী।
পাহাড়ঘেরা জনপদ সীতাকুণ্ডের কৃষকরা প্রতি মৌসুমেই বাম্পার ফলনের পর পড়েন নতুন এক সংকটে। স্থানীয় পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার না থাকায় উৎপাদিত পচনশীল কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কোনো সুযোগ নেই। ফলে মৌসুমের ঠিক এই সময়ে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে পড়ে যায় পণ্যের দাম। বাধ্য হয়ে কৃষকদের নামমাত্র মূল্যে ক্ষেতের ফসল বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় পাইকার না পাওয়া কিংবা পরিবহন সংকটের কারণে অতিরিক্ত ফসল ক্ষেতেই পচে নষ্ট হয়।
উপজেলার মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড, সৈয়দপুর ও কুমিরা এলাকার মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসাসহ বিভিন্ন মৌসুমি শাকসবজির প্রচুর ফলন হয়েছে। ক্ষেতভরা ফসল দেখে কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় চোখের সামনে মূল্যবান ফসল নষ্ট হতে দেখে অনেক কৃষককে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হচ্ছে।
কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসল যখন পচে মাটিতে মিশে যায়, তখন শুধু একটি ফসলই নষ্ট হয় না—নষ্ট হয় কৃষকের স্বপ্ন, ঋণ শোধের আশা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে করা পরিকল্পনাও।
কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে মৌসুমি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে সংরক্ষণ ব্যবস্থার চরম অনুপস্থিতি। সরকারিভাবে কোনো হিমাগার বা সংরক্ষণাগার না থাকায় প্রান্তিক কৃষকদের অনেকেই চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। কিন্তু উৎপাদনের পর সঠিক সময়ে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় তাদের।
কৃষকদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কারসাজিতেও তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কেনা পণ্যই কিছুদিন পর সাধারণ ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হয় চড়া দামে। ফলে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে বাড়তি দামে পণ্য কিনে ভোগান্তিতে পড়েন ভোক্তারাও।
এই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বহু ঐতিহ্যবাহী কৃষক পরিবার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এসব পরিবারের কাছে কৃষিই ছিল জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু উৎপাদনের পর ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার অনিশ্চয়তা সেই সম্পর্কেও ফাটল ধরাচ্ছে।
স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. আবদুল মালেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ বছর মেহনত করে দুই বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছি। ফলনও খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কম দামে সব বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। পাইকাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেয়। সরকার যদি এলাকায় একটা সরকারি হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ করে দিত, তবে আমাদের এই দুর্ভোগ আর থাকত না।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, হিমাগার না থাকায় প্রতি বছর এখানে ‘৩০-৪০ শতাংশ সবজি অপচয় হয়’। বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য এভাবে নষ্ট হওয়ায় শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও।
কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ এবং কৃষকের নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে অবিলম্বে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে হিমাগার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। তা না হলে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও লোকসান বাড়বে, অন্যদিকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
সংরক্ষণ সুবিধার অভাব ও কৃষকদের এই সংকটের বিষয়ে স্থানীয় কৃষি প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও সমস্যাটি স্বীকার করেছেন এবং বিকল্প ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান জানান, ‘সীতাকুণ্ডে মৌসুমি সবজি ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশ ভালো হচ্ছে। তবে হিমাগার না থাকায় কৃষকদের কিছুটা লোকসানের মুখে পড়তে হয়, বিষয়টি আমরা জানি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে আলোচনা চলছে এবং সরকারিভাবে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করছি অচিরেই এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস মিলছে, ঊর্ধ্বতন মহলে আলোচনা চলছে, কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে—কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই হিমাগার কবে বাস্তবে নির্মিত হবে, তার অপেক্ষায় সীতাকুণ্ডের কৃষক।
কারণ কৃষকের কাছে সময়ের মূল্য অনেক। ফসল একবার পেকে গেলে তা আর অপেক্ষা করে না। সংরক্ষণের অভাবে দিনের পর দিন পড়ে থাকা টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি কিংবা শসা একসময় পচে যায়। মাটিতে মিশে যায় কৃষকের মাসের পর মাসের শ্রম, ঘাম আর বিনিয়োগ।
সীতাকুণ্ডের খেটে খাওয়া কৃষকদের ঘামে ফলানো এই সোনালী ফসল রক্ষায় এখন প্রয়োজন শুধু আশ্বাস নয়—প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। একটি আধুনিক হিমাগার হয়তো কৃষকের সব সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু তা তাদের পচনশীল ফসল ধরে রাখার সুযোগ দেবে, ন্যায্যমূল্যের আশায় অপেক্ষা করার শক্তি দেবে এবং বহু কৃষক পরিবারের স্বপ্নকে অকালে মাটিতে মিশে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









