এই নির্বাচন হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন রাশিয়ার অর্থনীতিতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে এবং ইউক্রেনের ড্রোন হামলা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরের তেল শোধনাগার ও গুদামেও পৌঁছাচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়া এবারও ডুমায় আধিপত্য ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাশিয়ায় শুরু হয়েছে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার নির্বাচন। ভোট চলবে রবিবার পর্যন্ত। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্বাচন জনগণের মত প্রকাশের সুযোগ। সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রকৃত বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত হলে সেই মত প্রকাশের সুযোগ কতটা অর্থবহ।
স্টেট ডুমার ৪৫০ আসনের অর্ধেক দলীয় তালিকা এবং বাকি অর্ধেক সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে পূরণ হবে। প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারবেন। তিন দিন ধরে ভোট নেওয়ার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ভোটের ব্যবস্থাও রয়েছে। একই সময়ে ১১টি অঞ্চলে গভর্নর এবং ৩৯টি অঞ্চলে আঞ্চলিক আইনসভার নির্বাচন হচ্ছে। রাশিয়া দখল করে রাখা ইউক্রেনের এলাকাগুলোতেও ভোট নেওয়া হচ্ছে।
২০০১ সালে গঠিত ইউনাইটেড রাশিয়া ২০২১ সালের নির্বাচনে ডুমার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছিল। এবারও দলটির বড় জয় প্রত্যাশিত। প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন। আছেন যুদ্ধবিষয়ক সংবাদদাতা ইয়েভগেনি পডদুবনিও, যিনি ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। দলটির প্রার্থীরা ইউক্রেন যুদ্ধ ও পুতিনের যুদ্ধসংক্রান্ত লক্ষ্যকে সমর্থন করছেন।

ইউনাইটেড রাশিয়ার বাইরে কমিউনিস্ট পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, এ জাস্ট রাশিয়া ও নিউ পিপল পার্লামেন্টে জায়গা ধরে রাখতে বা পেতে পারে। এসব দলকে সাধারণত ‘ব্যবস্থার ভেতরের বিরোধী দল’ বলা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা সরকারের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই একসঙ্গে ভোট দেয়।
কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন ৮২ বছর বয়সী গেন্নাদি জিউগানভ। পুতিন সরকারের কিছু নীতির সমালোচনা করলেও দলটি তাঁর সরাসরি বিরোধিতা করেনি এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে সমর্থন করে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও যুদ্ধের পক্ষে।
এ জাস্ট রাশিয়া মূলত সোভিয়েত অতীতের প্রতি নস্টালজিক মধ্যবয়সী ও বয়স্ক ভোটারদের সমর্থন চায়। আর ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে গঠিত নিউ পিপল নিজেদের তরুণ ভোটার ও প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবীদের জন্য তুলনামূলক উদারপন্থী দল হিসেবে তুলে ধরে। আগের নির্বাচনে দলটি ৫ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট পেয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেকজান্ডার ব্রাতেরস্কির মতে, এবার দ্বিতীয় অবস্থানে কোন দল আসে, তা গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিস্টরা দ্বিতীয় হলে তা অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের ইঙ্গিত হতে পারে। নিউ পিপল ভালো ফল করলে তা যুদ্ধবিরোধী ভোটারদের মনোভাবেরও কিছুটা প্রতিফলন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
রাশিয়ার নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে যুদ্ধের প্রকাশ্য বিরোধিতা করা একমাত্র দল ছিল ইয়াবলোকো। আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট দলটিকে নির্বাচনের বাইরে রাখে। আদালত দলটির যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে রাশিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের আহ্বানের সঙ্গে যুক্ত করে। এখন দলটি শুধু সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
পুতিন ক্ষমতায় আসার পর ২০০০ সাল থেকে প্রতিটি ডুমা নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়া জয়ী হয়েছে। তবে ফলাফল নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। ২০১১ সালের নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগের পর বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনেও স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও পরিসংখ্যানবিদেরা দলটির সরকারি ভোটের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। রুশ কর্তৃপক্ষ অবশ্য ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এবারের নির্বাচন তাই শুধু পার্লামেন্টের আসন বণ্টনের বিষয় নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং ক্রেমলিনের প্রতি অসন্তোষ কতটা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে—ভোটের ফল সেসব প্রশ্নেরও কিছুটা ইঙ্গিত দেবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









