সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথমে ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করা হলেও পরে সংশ্লিষ্ট দলীয় নেতারা ভিডিওতে থাকা তরুণীকে এমপির দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর এমপির লিখিত ব্যাখ্যা, তরুণীর পরিবারের বক্তব্য, ভাইরাল নথিপত্র এবং নতুন ভিডিও ফুটেজে উঠে আসা তথ্যগুলো নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাতক্ষীরার একটি দলীয় মিডিয়া-সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে দাবি করা হয়, এটি এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ভুয়া ভিডিও। তবে পরবর্তীতে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা জানান, ভিডিওতে দেখা তরুণী এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ‘‘এমপি তাদের জানিয়েছেন যে, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই বিয়েটি হয়েছে।’’
নিজের ফেসবুক পোস্ট ও লিখিত বিবৃতিতে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং গাড়িচালককে নিয়ে ঢাকার মগবাজারে শ্বশুর মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে অবস্থানকালে চালক ওবায়দুল্লাহ কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে কক্ষে প্রবেশ করান। পরে তাদের জিম্মি করে টাকা আদায় এবং আরও অর্থ দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যক্তিগত ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার হুমকি দেওয়া হয়।
এমপির অভিযোগ, তার চালক ওবায়দুল্লাহ এবং তার সহযোগীরাই পরিকল্পিতভাবে ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছেন।
ভিডিওতে থাকা তরুণী মরিয়ম বেগম এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, গাজী নজরুল ইসলাম তার বৈধ স্বামী। তার ভাষ্য, ‘‘আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে যা করেছি, তা বৈধ। আমাদের সম্মানহানি করতেই ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।’’
তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহও দাবি করেন, ২০২৬ সালের ১৭ জুন তার মেয়ের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘ভিডিও ধারণের ঘটনাটি তার মগবাজারের অফিসেই ঘটেছে এবং এর পেছনে পারিবারিক বিরোধের জের রয়েছে।’’
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমও পৃথক ভিডিও বার্তায় দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করে অপপ্রচার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরও কিছু ভিডিও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ওই ভিডিওগুলোতে কয়েকজন ব্যক্তিকে গাজী নজরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়। কথোপকথনে বারবার ‘নীলা’ নামের এক নারীর বাসার কথা উল্লেখ করা হয়।
ভিডিওতে শোনা যায়, এক ব্যক্তি বলছেন, ‘‘এটা নীলার বাসা বাড়ি ভাড়া দেয়।’’
আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘‘আগে কয়বার এসেছেন? আমরা কয়েক দিন ধরে আপনাকে এখানে আসতে দেখেছি।’’
তবে ভিডিওতে উত্থাপিত এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নীলা নামে উল্লেখিত ব্যক্তির পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার অন্যতম আলোচিত দিক হচ্ছে ভাইরাল সিসিটিভি ফুটেজের সময়।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভিডিওতে থাকা টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী ফুটেজটি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলাম এবং তরুণীর পরিবার দাবি করছেন, বিয়ে হয়েছে ২০২৬ সালের ১৭ জুন এবং ভিডিওর ঘটনা ২০২৬ সালের ১৩ জুলাইয়ের।
ফলে ভিডিও ধারণের সময় এবং বিয়ের দাবিকৃত সময়ের মধ্যে প্রায় তিন বছরের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিতর্কের আরেকটি বিষয় হলো একটি ভাইরাল বায়োডাটা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই নথিতে দেখা যায়, গাজী নজরুল ইসলাম ২২ জুন ২০২৬ তারিখে ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে স্বাক্ষর করেছেন।
তবে একই নথিতে সংশ্লিষ্ট তরুণীর বৈবাহিক অবস্থার ঘরে ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে। যদি এমপির দাবি অনুযায়ী ১৭ জুন বিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে পাঁচ দিন পর প্রস্তুত নথিতে কেন তাকে অবিবাহিত দেখানো হয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
তবে ওই বায়োডাটার সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জাতীয় নির্বাচনে জমা দেওয়া সংসদ সদস্যের হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রীর কোনো তথ্য ছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও নির্বাচন কমিশনের নথিপত্র পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতার বক্তব্য দল পর্যবেক্ষণ করছে। বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’
এদিকে, ঘটনাটিকে ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অনুত্তরিত রয়ে গেছে, ভাইরাল সিসিটিভি ফুটেজের প্রকৃত ধারণকাল কোনটি? ভিডিওটি মগবাজারের অফিসে ধারণ করা হয়েছে কি না? কথিত কাবিননামা ও বায়োডাটার সত্যতা কতটুকু? ভাইরাল ভিডিওতে উত্থাপিত ‘নীলা’ নামের ব্যক্তির পরিচয় কী? এমপির অভিযোগ অনুযায়ী চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের ঘটনায় কোনো মামলা বা জিডি হয়েছে কি না? ভিডিও ফাঁসের পেছনে কারা জড়িত?
এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রামাণ্য নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাটির অনেক দিকই অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। তবে একটি ভাইরাল ভিডিও ইতোমধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









