ভাবো, তুমি ঘড়ির দিকে তাকালে। কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে—এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড। তোমার কাছে বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক যে এ নিয়ে প্রশ্ন করাই অদ্ভুত মনে হতে পারে। সময় তো আছেই। সকাল আসে, দুপুর যায়, রাত নামে। আমরা বড় হই, পুরোনো ছবি দেখি, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করি। তাহলে সময়কে নিয়ে আবার প্রশ্ন কী?
কিন্তু একটু থামো। সত্যিই কি সময় নামে কোনো কিছু আছে? আর যদি থাকে, তা কি সত্যিই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বয়ে যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মানুষ প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে তর্ক করছে।
সময়কে আমরা সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করি—অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালেই তিনটিই অদ্ভুত হয়ে ওঠে। অতীত কোথায়? যা ঘটেছে, তা তো আর এখন নেই। আমাদের কাছে আছে শুধু তার স্মৃতি, বই, ছবি, ভিডিও বা অন্য কোনো রেকর্ড। কিন্তু ঘটনাটি নিজে আর বর্তমান বাস্তবতার অংশ নয়।
ভবিষ্যতের অবস্থাও আলাদা নয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের আছে আশা, ভয়, পরিকল্পনা ও অনুমান। কিন্তু ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো এখনো ঘটেনি। ফলে সেগুলোও আমাদের বর্তমান চিন্তার মধ্যেই আছে।
তাহলে বাকি থাকল বর্তমান—এই ‘এখন’।

নিশ্চয়ই এখন বাস্তব?
সমস্যা হলো, ‘এখন’ আসলে কতক্ষণ স্থায়ী? এক মিনিট? এক সেকেন্ড? নাকি তারও কম? তুমি যখন বলছ, ‘এখন’, সেই মুহূর্তটি শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি মুহূর্ত এসে গেছে। ফলে বর্তমানকে যদি একেবারে নিখুঁতভাবে ধরতে চাও, তাহলে সেটি যেন আলো আর অন্ধকারের মাঝখানের এক অতি সূক্ষ্ম সীমারেখা। এর কোনো দৈর্ঘ্য নেই।
এখান থেকেই সময়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করার একটি পুরোনো যুক্তি আসে। অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই, আর বর্তমানের কোনো স্থায়িত্ব নেই—তাহলে সময় আছে কোথায়?
এটি শুনতে হয়তো বুদ্ধির সঙ্গে খেলাচ্ছলে করা কোনো কৌশল মনে হচ্ছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বহু দার্শনিক ও পদার্থবিদ সত্যিই এই প্রশ্নকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।
আবার অন্য একটি দল ঠিক বিপরীত কথা বলে। তাদের ধারণার নাম ‘চিরন্তনবাদ’। এই ধারণা অনুযায়ী অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—তিনটিই সমানভাবে বাস্তব। আমরা হয়তো এখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু ১৯২৬ বা ২১২৬-ও বাস্তবতার কাঠামোর মধ্যে কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান।
এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত ‘ব্লক ইউনিভার্স’ বা ‘ব্লক মহাবিশ্ব’-এর কথা। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের পর এই ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পায়। এখানে সময়কে মহাকাশের মতোই চতুর্থ মাত্রা হিসেবে দেখা হয়। মহাকাশের সব বিন্দু যেমন কোনো না কোনোভাবে একই কাঠামোর অংশ, তেমনি সময়ের বিভিন্ন মুহূর্তও একই কাঠামোর অংশ হতে পারে।
আইনস্টাইনের বিখ্যাত বক্তব্য ছিল, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পার্থক্য আসলে এক ধরনের ‘একগুঁয়ে ও স্থায়ী মায়া’।
তবে এখানেই গল্প শেষ নয়।
আরেকটি ধারণা বলে, শুধু বর্তমানই বাস্তব। অতীত চলে গেছে, ভবিষ্যৎ এখনো আসেনি। এই মতকে বলা হয় ‘প্রেজেন্টিজম’ বা বর্তমানবাদ। আবার ‘গ্রোয়িং ব্লক ইউনিভার্স’ বা ‘বর্ধনশীল ব্লক মহাবিশ্ব’-এর ধারণা অনুযায়ী অতীত ও বর্তমান বাস্তব, কিন্তু ভবিষ্যৎ এখনো তৈরি হয়নি। ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে বাস্তবে যুক্ত হচ্ছে।
অর্থাৎ সময়ের ব্যাপারে যেন দর্শনের দোকানে নানা রকম প্যাকেট সাজানো আছে। প্রশ্ন হলো—কোনটি সত্য?
আরও বিস্ময়কর একটি সম্ভাবনা আছে। হয়তো সময় মহাবিশ্বের মৌলিক কোনো উপাদানই নয়। হয়তো এটি একটি ‘ইমার্জেন্ট প্রপার্টি’—অর্থাৎ আরও মৌলিক কিছু জিনিস থেকে উদ্ভূত একটি বৈশিষ্ট্য।
তাপমাত্রার কথাই ধরো। একটি ঘরের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস—এটি আমাদের কাছে অর্থপূর্ণ। কিন্তু একটি মাত্র অণুর কি তাপমাত্রা আছে? আসলে তাপমাত্রা হলো অসংখ্য অণুর সম্মিলিত আচরণ থেকে পাওয়া একটি ধারণা। একইভাবে, হয়তো সময়ও মহাবিশ্বের আরও গভীর স্তরে গিয়ে আলাদা কোনো মৌলিক বস্তু হিসেবে টিকে থাকে না।
এই প্রশ্নের শিকড় বহু পুরোনো।
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে দক্ষিণ ইতালির এলিয়ার দার্শনিক পারমেনিদিস বলেছিলেন, পরিবর্তন আসলে অসম্ভব। পৃথিবীকে আমরা বদলাতে দেখি, কিন্তু যুক্তির গভীরে গেলে পরিবর্তনের ধারণাটিই অসংগত বলে মনে হতে পারে। যা অস্তিত্বশীল, তা স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়।
পারমেনিদিসের ছাত্র জেনোও পরিবর্তন ও সময়ের প্রবাহ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কিছু যুক্তি দেখাতে চেয়েছিল, আমরা যে অবিরাম চলাচল দেখি, সেটি যুক্তির বিচারে এত সরল নয়।

কিন্তু প্রাচীন গ্রিসেই আরেক দার্শনিক ছিলেন—হেরাক্লিটাস। তাঁর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য ছিল পরিবর্তন। সবকিছুই যেন প্রবাহিত হচ্ছে, সবকিছুই ‘হয়ে উঠছে’। নদীর জলে তুমি একবার পা রাখলে, পরের মুহূর্তে সেই নদী আর আগের মতো থাকে না। সময়কে নদীর মতো বয়ে চলা হিসেবে কল্পনা করার ঐতিহ্যটি তাঁর চিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
দুই হাজার বছর পরে আইজ্যাক নিউটন সময়কে দেখলেন অন্যভাবে। তাঁর মতে, সময় হলো পরিবর্তনের পটভূমি। পৃথিবীতে কিছুই পরিবর্তন না হলেও সময় নিজের গতিতে চলতে থাকবে। সময় তাঁর কাছে ছিল পরম ও বাইরের একটি বাস্তবতা।
কিন্তু এখানেই আবার নতুন প্রশ্ন: পরিবর্তনের জন্য কি সময় প্রয়োজন?
ধরো, তুমি পাহাড়ে উঠছ। উচ্চতা বদলানোর সঙ্গে বায়ুচাপ বদলায়। গাড়ির গতি বদলায় যখন তুমি অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দাও। মাইক্রোস্কোপের লেন্স বদলালে ছবির স্পষ্টতাও বদলে যায়। তোমার প্রিয় ফুটবল দল জিতলে তোমার মেজাজ বদলায়, হারলে আবার অন্য রকম হয়।
কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে ‘সময় ধরে পরিবর্তন’ বলতে সাধারণত বোঝানো হয়—একটি নির্দিষ্ট রাশি বিভিন্ন মুহূর্তে বিভিন্ন অবস্থায় আছে।
এখানে একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে।
পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণে সময় সাধারণত আসে একটি চলক বা ‘প্যারামিটার’ হিসেবে—‘t’। এই t-এর বিভিন্ন মান বসিয়ে আমরা বলতে পারি, কোনো কণা কোথায় ছিল, এখন কোথায় আছে, কিংবা ভবিষ্যতে কোথায় থাকতে পারে। অর্থাৎ আমরা বিভিন্ন মুহূর্তের আলাদা আলাদা ছবি পাই।
কিন্তু ছবিগুলোর মাঝখানে কী আছে?
কোনো চলচ্চিত্রের কথা ভাবো। পর্দায় অসংখ্য স্থির ছবি দ্রুত একের পর এক দেখালে আমাদের মনে হয় মানুষ হাঁটছে, গাড়ি চলছে, পাখি উড়ছে। কিন্তু প্রতিটি ফ্রেম নিজে স্থির। তাহলে ছবিগুলোর মধ্যে ‘প্রবাহ’ কোথা থেকে এল?
সময় নিয়েও একই প্রশ্ন উঠতে পারে।
আমরা বলি, ‘সময় চলে যাচ্ছে’, ‘সময় আসছে’, ‘মুহূর্ত চলে গেল’। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণে এমন কোনো রহস্যময় স্রোত দেখা যায় না, যা অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে যাচ্ছে।
আপেক্ষিকতার তত্ত্বে অবশ্য দুই পর্যবেক্ষক সময়ের ব্যবধান নিয়ে ভিন্ন ফল পেতে পারেন। তারা ভিন্ন গতিতে চললে, অথবা ভিন্ন শক্তির মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে থাকলে, তাদের ঘড়ির গতি একে অন্যের তুলনায় আলাদা হতে পারে। কিন্তু এখানেও কোনো অদৃশ্য নদীর সন্ধান পাওয়া যায় না, যে নদীতে সময় নিজে ভেসে যাচ্ছে।
তাহলে আমরা যে সময়ের প্রবাহ এত স্পষ্টভাবে অনুভব করি, সেটি কী?
সম্ভবত আমাদের মস্তিষ্কের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে। আমরা স্মৃতি ধরে রাখি, বর্তমানকে অনুভব করি, ভবিষ্যৎ কল্পনা করি। ফলে আমাদের জীবনের গল্পটি একটি ধারাবাহিক পথের মতো মনে হয়—পেছনে অতীত, পায়ের নিচে বর্তমান, সামনে ভবিষ্যৎ।
কিন্তু মহাবিশ্ব কি সত্যিই এভাবেই চলে?
এখানেই বিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি। আমাদের সমীকরণগুলো পরিবর্তনকে বর্ণনা করতে পারে, ঘটনাগুলোকে সময়ের ক্রমে সাজাতে পারে। কিন্তু আমরা যে ‘সময় বয়ে যাচ্ছে’ বলে অনুভব করি, সেই প্রবাহের কোনো সরাসরি ব্যাখ্যা তারা এখনো দেয় না।
হয়তো আমাদের অনুভূতিতে কিছু একটা বাদ পড়ছে। হয়তো পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান তত্ত্বগুলো বাস্তবতার সম্পূর্ণ ছবি নয়।আর যদি তাই হয়, তাহলে ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকানোর পরও সবচেয়ে সহজ প্রশ্নটিই সবচেয়ে কঠিন থেকে যায়—
সময় কি সত্যিই বয়ে যায়, নাকি আমরা শুধু বয়ে যাওয়ার অনুভূতিটুকু নিয়ে বেঁচে আছি?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









