বার্লিনে বামপন্থীদের জয়, তুর্কি বংশোদ্ভূত নেত্রীর সামনে মেয়র হওয়ার সম্ভাবনা। বার্লিনে যখন রাজনৈতিক স্লোগান উঠছিল, তখন এলিফ এরাল্পের বয়স মাত্র ১০। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার জার্মানিতে পরিবারের গ্যারেজে বন্ধুদের নিয়ে হাতে আঁকা পোস্টার বানিয়েছিলেন তিনি। পোস্টারে ছিল পরিবেশ রক্ষার দাবি। রাজনীতিতে সেটিই ছিল তার প্রথম দিকের পদচিহ্ন।
তার বাবা-মাও তাকে রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তুরস্কের ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থান থেকে পালিয়ে জার্মানিতে আসা সমাজতন্ত্রী ও ট্রেড ইউনিয়নকর্মী এই দম্পতি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন রাজনৈতিক সমাবেশে।
৩৫ বছর পর সেই ছোট্ট মেয়েটিই এখন বার্লিনের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) নির্বাচনে বামপন্থী দল ডি লিংকের প্রার্থী এরাল্প সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। ফলে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের পরবর্তী গভর্নিং মেয়র হওয়ার পথে তিনি এগিয়ে আছেন। তবে মেয়র হতে হলে তার দলকে এখন আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে জোটসঙ্গী খুঁজতে হবে।
এরাল্পের জয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জার্মানির অভিবাসী সমাজ, আবাসনসংকট, বাম রাজনীতির প্রত্যাবর্তন এবং একই সময়ে দেশটিতে উগ্র ডানপন্থার উত্থানের প্রশ্ন। মিউনিখে তুর্কি বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া এরাল্প মেয়র হলে কয়েকটি নতুন নজির তৈরি হবে। জার্মানি একীভূত হওয়ার পর ১৯৯০ সালে বার্লিনে প্রথমবারের মতো ডি লিংকের কোনো প্রার্থী মেয়রের দায়িত্ব পাবেন। তুর্কি বংশোদ্ভূত প্রথম মেয়র এবং বার্লিনের প্রথম বর্ণের নারী মেয়রও হবেন তিনি।
এরাল্পের প্রচারের কেন্দ্রে ছিল সাধারণ বার্লিনবাসীর দৈনন্দিন জীবন। সাশ্রয়ী বাসস্থান, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসী ও শরণার্থীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
জয়ের পর দেওয়া বক্তব্যেও তিনি বলেছেন, এখন তার অগ্রাধিকার বার্লিনকে সবার জন্য সাশ্রয়ী করে তোলা।
দেশজুড়ে ভাড়া নিয়ন্ত্রণের পক্ষে তিনি প্রচার চালিয়েছেন। আরও বেশি আবাসন পৌরসভার মালিকানায় নেওয়ার কথাও বলেছেন। মেয়র হলে গৃহহীন মানুষদের জন্য নগর ভবনে নববর্ষের সংবর্ধনার মতো প্রতীকী উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
এরাল্পের রাজনৈতিক ভাষায় ‘সংহতির শহর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। তিনি চান বার্লিন শরণার্থীদের জন্য আরও উন্মুক্ত হোক, অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক পুলিশি তৎপরতা বন্ধ হোক এবং অভিবাসীরা নাগরিক সমাজে আরও বেশি অংশ নিক।

ডানপন্থার উত্থানের মাঝেও বামদের জয়
জার্মান রাজনীতিতে যখন অলটারনেটিভ ফর জার্মানি—এএফডি—দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, তখন বার্লিনের ফলটি আলাদা রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। এর দুই সপ্তাহ আগে স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডি জয় পেয়েছিল। বার্লিনে তারা হয়েছে তৃতীয়।
জার্মান রাজনৈতিক ও ডিজিটাল পরামর্শক মার্টিন ফুক্সের মতে, ভোটের ফলের পেছনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে। তার ভাষায়, এ ফল দেখাচ্ছে যে জার্মানিতে ডানপন্থার উত্থানের পাশাপাশি বৈচিত্র্যপূর্ণ, উন্মুক্ত ও উদার একটি সমাজও সক্রিয় রয়েছে।
তবে এরাল্পের সামনে পথ সহজ নয়। মেয়র হওয়ার জন্য তাকে জোট গড়তে হবে। আর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় সরকার এবং আইনি কাঠামোর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে আবাসননীতি নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
অভিবাসী পরিবারের মেয়ের রাজনীতি
রাজনীতিতে এরাল্প নতুন নন। ২০১৭ সালে ডি লিংকে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি দলের ভেতরে সক্রিয়। ২০২১ সাল থেকে বার্লিনের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সদস্য এবং ২০২৪ সাল থেকে দলের সংসদীয় গ্রুপের উপপ্রধান।
আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন হামবুর্গে। এক দশকেরও বেশি সময় ডি লিংকের আইনি পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় ইন্টার্নশিপও করেছেন। দলের ভেতরে অভিবাসী অধিকার নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছেন।
এই রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি রয়েছে তাঁর পারিবারিক ইতিহাস। তার বাবা-মা তুরস্কের সামরিক শাসন থেকে পালিয়ে জার্মানিতে এসেছিলেন। সেই অভিবাসী পরিবারের সন্তানই এখন এমন একটি শহরের নেতৃত্বের দ্বারপ্রান্তে, যেখানে ১৯৬০-এর দশক থেকে অভিবাসী জনগোষ্ঠী শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গেরো নয়গেবাউয়ারের ভাষায়, এরাল্প মেয়র হলে তা যেন বার্লিনের নিজস্ব পরিচয়েরই একটি প্রতিচ্ছবি হবে—‘দেখুন, এটাই বার্লিন।’

‘জার্মানির মামদানি’
এরাল্পের প্রচারণায় আরেকটি নাম বারবার এসেছে—নিউইয়র্কের বামপন্থী নেতা জোহরান মামদানি। সামাজিক ন্যায়বিচার ও বড় শহরের আবাসন ব্যয় কমানোর বার্তা দিয়ে মামদানির নির্বাচনী সাফল্যকে এরাল্পের দলও অনুসরণ করেছে।
দলের কয়েকজন সদস্য নিউইয়র্কে গিয়ে মামদানির প্রচারকৌশল এবং তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। এরাল্পও তাঁর বিজয়কে বিশ্বের বামপন্থী দলগুলোর জন্য একটি সম্ভাব্য মডেল হিসেবে দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এরাল্প ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। বিশ্লেষণ সংস্থা ভাইরাল ডট অ্যাপের হিসাবে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর প্রচারণার ভিডিও ও কনটেন্ট প্রায় ৬৩ লাখ ভিউ পেয়েছে—অন্য প্রার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি।
তাকে তাই অনেকে বলছেন ‘জার্মানির মামদানি’।
তবে এরাল্পের সামনে শুধু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নয়। ডি লিংককে ঘিরে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগও রয়েছে; দলকে এ ধরনের অভিযোগ থেকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে আলাদা করতে হবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও পপুলিজমের গবেষক এডওয়ার্ড গুডজারের মতে, জার্মানির ভোটারদের একটি অংশ এখন প্রতিষ্ঠিত মূলধারার দলগুলোর বাইরে তাকাচ্ছেন। সেই অসন্তোষের প্রকাশ ঘটছে একদিকে বামপন্থী, অন্যদিকে ডানপন্থী চ্যালেঞ্জার দলগুলোর প্রতি সমর্থনে। বার্লিনের রাস্তায় এখন তাই একটি নতুন প্রশ্ন ঘুরছে: তুর্কি অভিবাসী পরিবারের সেই মেয়েটি কি সত্যিই শহরের মেয়র হবেন?
উত্তরটি এখনো জোটের হিসাবের মধ্যে আটকে আছে। কিন্তু তার জয় ইতিমধ্যেই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—জার্মানির রাজনৈতিক কেন্দ্রের বাইরে তাকাচ্ছেন দেশটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার।
সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









