কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙন দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভুরকা-হাটখোলা থেকে কোলদিয়ার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে অব্যাহত রয়েছে নদীভাঙন। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, চার ফসলি জমি, ফলের বাগান ও বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ।
ভাঙনকবলিত মানুষের দুর্দশা সরেজমিনে দেখতে রোববার সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোলদিয়ার হাটখোলাপাড়া, মাজদিয়ার ও ভুরকা এলাকার নদীভাঙন পরিদর্শন করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রশিদুর রহমান, দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পরিদর্শনকালে শত শত ক্ষতিগ্রস্ত নারী-পুরুষ জেলা প্রশাসকের সামনে তাঁদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। তারা জানান, নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে বহু পরিবারের ফসলি জমি, আম-কাঁঠালের বাগানসহ বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবিকার অবলম্বন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ভারত থেকে আমদানি করা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জাতীয় সঞ্চালন লাইন নদীভাঙনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ ছাড়া হুমকির মুখে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী রায়টা-মহিষকুণ্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, জুনিয়াদহ বাজার, হাটখোলাপাড়া জামে মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ও স্থাপনা। নদীভাঙনের কারণে এলাকার বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নদী ভরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভুরকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়ার কান্দিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়ার মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং জুনিয়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। ভুরকা, কোলদিয়ার, জুনিয়াদহ ও কোলদিয়ার পূর্বপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা দ্রুত অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও সিমেন্টের ব্লক ফেলে ভাঙন রোধের কাজ শুরু করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
এলাকাবাসীর আশা, প্রশাসনের এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে অন্তত সাময়িকভাবে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের মানুষ স্থায়ীভাবে নদীভাঙনের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাবে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রশিদুর রহমান বলেন, পদ্মা নদীর ভাঙনের পরিস্থিতি আমরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। মানুষের জানমাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মোঃ তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, ভাঙনকবলিত মানুষের এই মানবিক বিপর্যয় অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বাজেটের চাহিদা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই নদীতীরে জিও ব্যাগ ফেলা এবং অন্যান্য জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু করা হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









