গবাদি পশু পালন ও দুধ উৎপাদনের জন্য সারা দেশে পরিচিত জেলা পাবনা। এখানকার উৎপাদিত দুধের ব্যাপক চাহিদাকে পুঁজি করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ভেজাল দুধ তৈরির একটি সক্রিয় অসাধু চক্র। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, জরিমানা ও কারাদণ্ডের পরও থামছে না এই অবৈধ ব্যবসা। বরং ভালো দুধের সঙ্গে ভেজাল দুধ মিশিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ও গোপনে ভেজাল দুধ তৈরির কার্যক্রম চলছে। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল এবং সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত চলে এই অপতৎপরতা।
সম্প্রতি ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে কেয়া ডেইরিকে তিন লাখ, আমিনা ডেইরিকে ৩০ হাজার এবং প্রিমিয়াম ফুডকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর আগে বেড়া উপজেলার নাকালিয়া ও পেঁচাকোলা বাজারে অভিযান চালিয়ে ভেজাল দুধ তৈরির প্রমাণ পাওয়ায় জয়দেব ঘোষ নামের এক ব্যবসায়ীকে দুই লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
সর্বশেষ ভাঙ্গুড়া উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামে বিশেষ অভিযানে ২০০ লিটার ভেজাল দুধ, বিষাক্ত কেমিক্যাল ও সরঞ্জামসহ আশরাফুল আলী নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, খাঁটি দুধ থেকে ননি তুলে নেওয়ার পর তাতে পানি মেশানো হয়। পরে পাম অয়েল বা সয়াবিন তেল বিশেষ প্রক্রিয়ায় নকল ননিতে রূপান্তর করে সেই দুধে মেশানো হয়। এছাড়া ছানার পানির সঙ্গে ডিটারজেন্ট, কস্টিক সোডা, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে বিষাক্ত ভেজাল দুধ।
স্থানীয় খামারি ও দুধ সংগ্রহকারীরা জানান, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে খাঁটি দুধ উৎপাদনকারী খামারিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে জেলার ঐতিহ্যবাহী দুগ্ধশিল্পও হুমকির মুখে পড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিটারজেন্ট, কস্টিক সোডা ও অন্যান্য রাসায়নিক মিশ্রিত ভেজাল দুধ শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন এসব দুধ পান করলে কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শক নুরুল ইসলাম জানান, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে চিলিং সেন্টারগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উৎপাদিত ও সংগ্রহকৃত দুধের পরিমাণ যাচাই করে অনিয়ম শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি বলেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাদ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করছে। ভেজাল দুধের কারবার পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ভেজাল দুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তবে দুধে ভেজাল শনাক্তের জন্য জেলায় আধুনিক পরীক্ষাগার না থাকায় কার্যক্রমে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে মাসে একবার রাজশাহী থেকে ভ্রাম্যমাণ ল্যাব এসে পরীক্ষা পরিচালনা করে। পাবনায় একটি স্থায়ী আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা গেলে ভেজাল দুধ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









