আজ ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ ও টানা আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বৈরশাসক প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের অবসান ঘটে।
সেদিন কারফিউ উপেক্ষা করে দুপুরে সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার মিছিল বের হলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। বেলা পৌনে ২টার দিকে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে আনন্দ মিছিল বের হয়। তবে সেই মিছিলে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এতে সিলেট নগরে তিনজন এবং বিয়ানীবাজার পৌরশহরে তিনজন নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায়ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।
৫ আগস্ট সকালে সিলেট নগর ছিল অনেকটাই নিস্তব্ধ। চৌহাট্টা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকাজুড়ে বিরাজ করছিল থমথমে পরিস্থিতি। কারফিউ বাস্তবায়নে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন ছিলেন। দুপুরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহীদ মিনার এলাকায় জড়ো হন হাজারো মানুষ। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে মিলিত হয় শহীদ মিনারে। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো নগর মিছিলমুখর হয়ে ওঠে।
সেদিনের স্মৃতিচারণ করে সিলেট মহানগর শিবিরের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, “সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কারফিউ ভেঙে শহীদ মিনারের দিকে ছাত্র-জনতার একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল অগ্রসর হলে পুলিশ গুলি চালায়। এরপর সংঘর্ষ ও পাল্টা প্রতিরোধ শুরু হয়। আমাদের হাতে আত্মরক্ষার একমাত্র উপায় ছিল রাস্তার ইট। পুলিশ আধুনিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে। এতে বহু ভাই-বোন আহত হন।”
তিনি আরো বলেন, ''শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর পাওয়ার পর পুলিশ আত্মসমর্পণ করে। আমাদের নেতাকর্মীরা তাদের নিরাপত্তা দিয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দেন।”
সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ বলেন, “বেলা সোয়া ১টার দিকে কারফিউ ভেঙে নগরের জিন্দাবাজারের তাঁতিপাড়া গলি থেকে আমরা একটি মিছিল বের করি। শহীদ মিনার ও বন্দরবাজারের দিক থেকে সেই মিছিলে যৌথ হামলা হয়। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ চলে।”
তিনি আরো বলেন, “বেলা ২টার দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহীদ মিনার থেকে সুরমা নদীর তীরবর্তী কিনব্রিজ পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। জাতীয় পতাকা হাতে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ সব বয়সী মানুষ বিজয় মিছিলে অংশ নেন।”
সেদিন বিকেলে কিনব্রিজসংলগ্ন এলাকায় একটি মিছিলের সময় কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। হাফিজ পাভেল আহমদ কামরুল ও পঙ্কজ কুমার কর নিহত হন। একই দিনে গোয়াইনঘাট উপজেলায় গুলিতে দুজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও সেই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এর আগের দিন বিকেলে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা ও গুলিতে ছয়জন নিহত হন। ৫ আগস্ট শোকের সেই আবহের মধ্যেও গোলাপগঞ্জে আনন্দ মিছিল বের হয়। পাশের বিয়ানীবাজার পৌরশহরেও বিজয় মিছিল বের হলে সেখানে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের বিরুদ্ধে। এতে রায়হান আহমদ, তারেক আহমদ ও ময়নুল হোসেন নিহত হন।
সেদিন বিভিন্ন স্থানে ক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিকেলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী একটি পিকআপ ভ্যানে করে নগরজুড়ে মাইকিং করেন।
রাত থেকে সিলেটের সংখ্যালঘু ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তায় আলেম সমাজের প্রতিনিধি, বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পাহারায় অংশ নেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









