গায়েবি মসজিদ। নামটার মধ্যই রহস্যের ছোঁয়া। সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উছমানপুরে অবস্থিত ‘গায়েবি মসজিদ’ রহস্যময় ভাবে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। যা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মসজিদের নির্মাণকাল অজানা থাকলেও প্রায় হাজার বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হয়। সুলতানি আমলে নির্মিত এই মসজিদটি কেবল প্রার্থনালয়ই নয়, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাজপুর-বালাগঞ্জ রোডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন রহস্যময় স্থাপনাটি। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদের সঠিক নির্মাণকাল ও নির্মাতার পরিচয় জানা না থাকলেও এটি আবিষ্কারের অলৌকিক কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহজালাল (রা.) সিলেটে আগমনের আগেই টুলটিকরে সাধক হযরত বোরহান উদ্দিন (রা.) ওরফে নূরউদ্দিন বসতি স্থাপন করেছিলেন। পরে শাহজালালের সফরসঙ্গী সৈয়দ উম্মর ছমর খন্দের তিন সন্তান সৈয়দ মাহবুব খন্দকার, সৈয়দ তাহির খন্দকার এবং অপর আউলিয়া সৈয়দ ওসমান বোগদাদী বর্তমান উসমানপুরে আগমন করেন।
সেসময় এই অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। তখন এই এলাকার নাম ছিল ভগবানপুর। সেখানেই বরাক নদীর তীরে ওসমান বোগদাদী নামাজ আদায়ের লক্ষে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সুলতানি আমলে প্রায় ৮শ থেকে হাজার বছর পূর্বে মসজিদটি নির্মিত হয় বলে স্থানীয় লোককথা রয়েছে।
প্রচলিত আছে, একসময় মসজিদটি টিলা-জঙ্গলের আড়ালে হারিয়ে যায়। বাড়ি তৈরী করতে গিয়ে জঙ্গল ও টিলা কেটে মসজিদটি পুনরুদ্ধার করা হয়। টিলা কাটতে গিয়ে হঠাৎ কোদালের আঘাতে একটি পাকা স্থাপনার অংশ বেরিয়ে আসে। মাঠি খোঁরার পর স্থাপনার কিছু অংশ বেড়িয়ে আসলে মুসলমানরা এটি হয়তো তাদের মসজিদ, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা এটিকে মন্দির বলে দাবি করেন। পরবর্তী সময়ে উভয় পক্ষের সম্মতিতে খনন কাজ চলে। অবশেষে পাওয়া স্থাপনটি মসজিদ বলে চিহ্নত করা হয়।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এটা ছিল ঐশ্বরিক ইঙ্গিত, যা নতুন বসতির দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। সেই থেকে এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচয় পায়। মসজিদটি দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিম ধর্মালম্বীয়রা ছুটে আসে। শিল্পকলার নিখুঁত কারুকাজে ভরপুর শত বছরের প্রাকৃতিক ক্ষয়-ক্ষতির পরও দেয়ালের গায়ে জেগে আছে প্রাচীন সভ্যতার স্পর্শ। অনেককাল বন-জঙ্গলে ঢাকা থাকলেও মসজিদটি আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে। সৈয়দ ওসমান বোগদাদী (রা.)-এর নাম অনুসারে গ্রামটির নামকরণ হয় উসমানপুর। গ্রামের মানুষের স্মৃতিচারণে এখনো ভেসে ওঠে গায়েবি মসজিদের সেই রহস্যময় আবির্ভাবের লোকগল্প।
উসমানপুর গায়েবি মসজিদ প্রাচীন ইসলামী স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদের নির্মাণশৈলীতে তৎকালীন কারিগরদের দক্ষতা, নকশাবোধ ও স্থাপত্যজ্ঞান ফুটে ওঠে। সময়ের ব্যবধানে স্থাপনাটির অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর পুরোনো নির্মাণকৌশল এখনো প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বহন করে।
মসজিদের স্থাপত্যে স্থানীয় নির্মাণরীতির সঙ্গে তৎকালীন ইসলামী স্থাপত্যের প্রভাবের সমন্বয় দেখা যায়। ইটনির্ভর নির্মাণ, পুরু দেয়াল, খিলান ও গম্বুজধর্মী কাঠামো এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। দেয়াল ও স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত অলংকরণে কারিগরদের সূক্ষ্ম কাজের পরিচয় পাওয়া যায়।
প্রাচীন বাংলায় পাথরের তুলনায় পোড়ামাটির ইট সহজলভ্য হওয়ায় ইটের ওপরই স্থাপত্যশিল্পের বড় অংশ গড়ে উঠেছিল। উসমানপুর গায়েবি মসজিদেও সেই ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে। ইটের বিন্যাস, দেয়ালের গঠন এবং অলংকরণে সরলতার পাশাপাশি নান্দনিকতারও প্রকাশ ঘটেছে।
মসজিদের প্রতিটি স্থাপত্য উপাদান শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, মধ্যযুগীয় বাংলার নির্মাণপ্রযুক্তি ও কারুশিল্পের সাক্ষ্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃতি ও মানুষের নানা প্রভাব সহ্য করেও স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশ প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।
স্থানীয় প্রবীণ লেখক আব্দুল হাই মোশাইদ বলেন, শত-শত বছর ধরে এ মসজিদ মুসলমানদের আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মসজিদটি হযরত শাহজালাল (র.)-এর আগমন পূর্বেকার আগন্তুক মুসলিমদের দ্বারা নির্মিত। এটি আমাদের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









