স্থানীয় সরকার বিভাগ অনেক আগেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। তারপরও থেমে নেই সরকারি কার্যক্রম। প্রতিদিন শত শত মানুষকে সেবা দিতে একই ভবনে কাজ করছেন ছয়টি সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। মাথার ওপর ঝুলছে ফাটলধরা ছাদ, খসে পড়ছে পলেস্তারা, বেরিয়ে এসেছে মরিচাধরা রড। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে অফিসকক্ষে ঢুকে পড়ে পানি। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলছে সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম।
এ চিত্র বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের প্রায় প্রতিটি ব্লকেই সময়ের ক্ষত স্পষ্ট। ছাদের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে ইট ও রড উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ছাদের কংক্রিট ভেঙে ঝুলে আছে। বর্ষা মৌসুমে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও আসবাবপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলেই ভাঙাচোরা অবকাঠামো আর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সহজেই চোখে পড়ে।
কর্মকর্তারা জানান, প্রায়ই ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। তারপরও প্রয়োজনের তাগিদে আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন অফিস করতে হচ্ছে।
বর্তমানে এই ভবনে উপজেলা সমবায় কার্যালয়, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয়, উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয় এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়সহ ছয়টি সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের জন্য ৬ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
সেই সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনের একটি আমবাগান কেটে নতুন ভবনের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। তবে পরবর্তীতে জমি-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেওয়ায় প্রকল্পটির কার্যাদেশ বাতিল হয়ে যায়। এরপর চার বছর কেটে গেলেও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ আর শুরু হয়নি।
এদিকে পুরোনো ভবনের অবস্থা দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সেখানেই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসনাইন আহমেদ বলেন, আমরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অফিস করছি। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে নির্মাণকাজের অনুমোদন পাওয়া যাবে।
বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিল্টন চন্দ্র পাল বলেন, ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। শুধু অফিস কক্ষ নয়, এর শৌচাগারও এখন ব্যবহার অনুপযোগী। আগে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি নির্ধারণ-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেছি।
প্রতিদিন এই ভবনে সরকারি নানা সেবা নিতে শত শত মানুষ আসেন। ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। ফলে অজান্তেই তারা নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির বেহাল অবস্থার কথা জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।
তাদের দাবি, বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আগেই জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পরিত্যাগ করে বিকল্প স্থানে সরকারি দপ্তরগুলো স্থানান্তর এবং নতুন প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করা হোক।
একদিকে কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির, অন্যদিকে পরিত্যক্ত ভবনের ভেতর চলছে প্রতিদিনের সরকারি কার্যক্রম। ফলে বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনিক ভবন এখন শুধু একটি জরাজীর্ণ স্থাপনা নয়, এটি সরকারি অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার দীর্ঘসূত্রতা ও পরিকল্পনাহীনতারও এক নীরব প্রতীক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









