ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। গত সাত মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪২ জনের। বড় দুর্ঘটনার খবর আলোচনায় এলেও প্রতিদিনের ছোট-বড় দুর্ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। এসব দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি, ত্রুটিপূর্ণ সড়কব্যবস্থা এবং মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা-লেগুনাসহ অবৈধ যানবাহনের চলাচলকে দায়ী করছেন।
সর্বশেষ গত শুক্রবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী শিশুসহ নয়জন নিহত হন। ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের বাস দুটির সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। এর আগে গত ৩ মে দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় কাঠবোঝাই ট্রাক ও শ্রমিক বহনকারী ডিআই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন আটজন। চারজন ঘটনাস্থলে এবং চারজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সিলেটের মহাসড়কগুলোতে ১৮৫টি দুর্ঘটনায় ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৬৬ জন। অর্থাৎ ছয় মাসে গড়ে প্রতি মাসে ৩১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং মারা গেছেন ২০ জন।
ছয় মাসে ১৮৫ দুর্ঘটনা হাইওয়ে পুলিশের শেরপুর থানার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৩টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হন। মার্চে ১৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৪ জন। এপ্রিলে ১৩টি দুর্ঘটনায় মারা যান ১৪ জন।
মে মাসে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২টিতে। এতে নিহত হন ২২ জন। জুনে দুর্ঘটনা কিছুটা কমে ১৯টিতে নামলেও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয় ২৯। ছয় মাসের মধ্যে জুনেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জুলাইয়ে ১২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৪ জন।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটির হিসাবও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) সিলেট বিভাগে ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৯ জন নিহত ও ৩৬১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশেই ২৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪২ জনের।
একই স্থানে বারবার দুর্ঘটনা দুর্ঘটনার স্থানগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সব জায়গায় সমানভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে না। তেলিবাজার, রশিদপুর, দয়ামীর ও কাশিকাপন এলাকায় দুর্ঘটনার প্রবণতা বেশি। পরিবহনশ্রমিক নেতাদের মতে, এসব এলাকায় মহাসড়কের ওপর সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা ও পিকআপ চলাচল করে। পাশাপাশি কিছু জায়গায় বিপজ্জনক বাঁক ও সড়কের কাঠামোগত ত্রুটিও রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন এদিনকে বলেন, আন্তজেলা সড়কে প্রায় এক হাজার চালক, সহকারী ও সুপারভাইজার রয়েছেন। তাদের সবার চালনার ধরন এক নয়। কেউ নিয়ম মেনে গাড়ি চালান, আবার কেউ বেপরোয়া গতিতে চালান।
তার ভাষ্য, তেলিবাজার, রশিদপুর, দয়ামীর ও কাশিকাপনে কেন বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এসব এলাকায় নিয়মিত সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা ও পিকআপ চলাচল করে। মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচলের কথা নয়। এ বিষয়ে প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার দাবি জানালেন তিনি।
যানবাহনের গতি ও ক্লান্তির ঝুঁকি হাইওয়ে পুলিশের শেরপুর থানার ওসি আনিসুর রহমানের মতে, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ চালকদের বেপরোয়া গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিং। তিনি বলেন, দীর্ঘ যাত্রার কারণে শেরপুর থেকে সিলেটের দিকে আসতে আসতে চালকদের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি হয়। একই সঙ্গে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়াও থাকে। ফলে চালকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে মহাসড়কের শেরপুর থেকে সিলেট অংশের কয়েকটি এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে।
গত ৩ মে তেলিবাজারের দুর্ঘটনাটি চালকের ক্লান্তির ঝুঁকি সামনে আনে। ওই ঘটনায় চলন্ত অবস্থায় চালক ঘুমিয়ে পড়ার পর হেল্পার
(সহকারী) গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। এ দুর্ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়।
প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণের দাবি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট জেলা শাখার আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মিশু বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশ ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং সড়কের নির্মাণগত ত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।
তা মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি চালকেরা যাতে টানা আট ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালান, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সব অংশীজনকে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ এবং মহাসড়কে আইন প্রয়োগে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









